পিতা – মাতার ভরণ পোষণ আইন – ২০১৩ তে যা যা বলা হয়েছে ।

আইনের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য আইন – এই বিতর্কে আমার অবস্থান সঙ্গত কারণেই ‘ মানুষের জন্য আইন ’ – এর পক্ষে । কিন্তু কিছু কিছু আইন প্রণয়ন হতে দেখে ভীষণভাবে বিস্মিত হয়ে পড়ি । মনে প্রশ্ন জাগে কী এমন ঘটনা ঘটে গেলো যে এমন আইন করতে হল ? ঠিক তেমনি একটা আইন ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর প্রণীত হয়েছে যার নাম শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে – পিতা – মাতার ভরণ পোষণ আইন !

আমাদের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় যৌথ পারিবারিক কাঠামো একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য । পিতা – মাতা, ভাই – বোন, চাচা – চাচি, তাদের সন্তান – সন্ততি, এদের প্রত্যেকের বউ –ছেলে – মেয়ে ইত্যাদি মিলিয়ে একটা বিশাল পরিবারের সদস্য সবাই । পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ফলে এই ব্যবস্থা এখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার প্রহর গুনছে । গ্রামে তাও কিছুটা টিকে থাকলেও শহরের মেকী চাকচিক্যে ঢাকা জঞ্জালেভরা দ্রুত জীবনে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে । বস্তুর প্রতি মোহ আমাদের ভোগের নদীতে কেবল জোয়ার বইয়ে দিয়ে যাচ্ছে । পণ্য’র সুষম ভাগ আমাদেরকে এখন আর তৃপ্ত করে না । ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের নামে ব্যক্তিসর্বস্বের মতো চাই পুরোটা । এই পুরোটা আহরণ করতে গিয়ে ঠকানোটাও শিখে গেছি নিপুণভাবে ।

যা ছিল হাজার বছরের রীতি – নিয়ম । তাকেই এখন বরণ করে নিয়েছি আইন হিসেবে । রীতি পালন করায় বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন – অগ্রজদের সম্মানকরা বা অনুজদের স্নেহ করা একটি রীতি – এটা কেউ পালন না করলে তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা যায়না । মাতা – পিতার দেখভাল করা সামাজিকভাবে স্বীকৃত রীতি ছিল এতদিন। একে আইনের গণ্ডির মধ্যে এনে সন্তানদেরকে আবদ্ধ করে ফেলতে হবে এমন বিচক্ষণ ভাবনা (!) আমাদের ক’জনের সৎ ও স্বাভাবিক মননে বাসা বেঁধেছিল । কিন্তু বিষয়টা এমন সরল ভাবনার স্তরে ছিল না । পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছিল বলেই সন্তানের দায় দায়িত্ব কে আইনী বাধ্য বাধকতায় আনতে হয়েছে । বলাবাহুল্য, এই আইনটি আমাদের একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি ণঞর্থক ব্যাপারগুলির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে সেই সাথে আমাদের সমাজের দগদগে ক্ষতকে বড়বেশী স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলছে ।

ভূমিকা অনেক দীর্ঘায়িত হওয়ায় দুঃখিত । এবার আইনটি সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক । এই আইনে “ভরণ-পোষণ” অর্থ –

ক) খাওয়া-দাওয়া,
খ) বস্ত্র,
গ) চিকিৎসা ও
ঘ) বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান;

প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে।

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে।

কোন সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তার, বা ক্ষেত্রমত, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না।

প্রত্যেক সন্তান তার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে।

পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তান হতে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তার, বা ক্ষেত্রমত, তাদের সাথে সাক্ষাত করতে হবে।

কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে।

*** পিতা – মাতার অবর্তমানে – প্রত্যেক সন্তান তার –

ক)পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে; এবং

(খ) মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে
ভরণ – পোষণ করবে ।

*** পিতা – মাতার ভরণ – পোষণ না করবার দণ্ড –

ক) অনূর্ধ্ব (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে;
খ) বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

কোন সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমত, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকট আত্নীয় ব্যক্তি—

(ক) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করলে; বা

(খ) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করলে—

তিনি উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছে গণ্যে উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হবে।


*** অপরাধের আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতা –

এই আইনের অধীন অপরাধ –

ক) আমলযোগ্য (cognizable),
খ) জামিনযোগ্য (bailable) ও
গ) আপোষযোগ্য (compoundable) হবে।

*** অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ ও বিচার –

Code of Criminal Procedure, 1898 (Act V of 1898) এ যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ ১ম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে।

কোন আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করবে না।


*** আপোষ – নিষ্পত্তি –

আদালত এই আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার, কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর, কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করতে পারবে।

কোন অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয়পক্ষকে শুনানীর সুযোগ প্রদান করে, তা নিষ্পত্তি করবে এবং এরূপে নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে।

পরিশেষে বলবো, আমরা যাতে নিচে নামতে নামতে এতোটা নিচে নেমে না যাই যাতে করে আমাদের অসহায় মাতা – পিতা, নিকটাত্মীয় বেঁচে থাকার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। আইনের সার্থকতা হোক এমন – সমাজে আইন আছে কিন্তু আইন প্রয়োগ করার কোন দরকার পড়ে না ।

সূত্র – http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_all_sections.php?id=1132

Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: