ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিয়ে, বিশেষ বিবাহ আইন ও বাস্তবতা

মানুষ মানুষে জন্য আর তাই একজন মানুষ অন্য একজনের সাথে মিশবে, ভালবাসবে আপন হবে এটাই স্বাভাবিক আর দুজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সেই ভালবাসাকে একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মানুষ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাকে বেছে নেয়। বিয়ের ফলে যেমন নিজেদের সম্পর্কের ভিত শক্ত হয় তেমনি সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভাল ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই সম্পর্ক যখন দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের মাঝে হয় তখন অনেক সময়েই সে সম্পর্কটি ধর্মের বিভেদের কারণে সহজে এক হোতে পারে না। মূলত দুটি উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।

১. সাধারণ বিয়ের মাধ্যমে; কোন একটি ধর্ম মেনে সেই ধর্ম মতে বিয়ে করে।
২. বিশেষ ভাবে বিবাহ করে। – আসুন এই দুইটি বিষয় একটু বিস্তারিত ভাবে বুঝি।

সাধারণ বিয়ে:

বাংলাদেশে বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তি বণ্টন, ভরণপোষণ ইত্যাদি বিষয় যার যার নিজে ধর্ম মতে হয়ে থাকে যদিও কিছু ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে রাষ্ট্র তার মত করে আইন করেছে। সাধারণ যারা বিয়ে করেন তার দুজন-ই একই ধর্মের হয়ে থাকেন এবং তাদের ধর্মিয় রীতি মেনেই বিয়ে হয়ে থাকে। তবে আবার প্রায় সব ধর্মের মধ্যেই কিছু সাধারণ ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ আছে যেখানে সাধারণত বলা থাকে কিভাবে অন্য ধর্মের কাউকে নিজ ধর্ম মেনে বা নিজ ধর্মতে এনে বিয়ে করা যায়।

ইসলাম ধর্মে মেনে ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করার উপায়:

যদি অন্য যে কোন ধর্মের কাউকে মুসলিম করে নেওয়া যায় তাহলে আর বিয়ে করতে কোন সমস্যা থাকে না, অর্থাৎ বিয়েটি ‘বৈধ বিয়ে’। আর যদি অন্য পক্ষ কিতাবিয়া হয় অর্থাৎ কোরআন বাদে অন্য মূল তিনটি কিতাবের অনুসারী হয়ে থকে [তাওরাত, যাবুর ও ইনযিল] সহজ ভাষায় বলতে গেলে যারা ইহুদি বা খৃষ্টান তাদের বিয়ে করা যাবে তবে সেটি অনিয়মিত বিবাহ হবে, বিবাহটি নিয়মিত হতে হলে সেই ব্যক্তিকে মুসলিম হতে হবে।

তবে এখানে কিছু বিষয় বুঝে এগুতে হবে। যেমন এই অনিয়মিত বিয়েতে দাম্পত্য সম্পর্ক পালন করে যাবে, সন্তান নেওয়া যাবে কিন্তু বিয়েটি নিয়মিত বিয়েতে রূপান্তরিত না হলে সেই ব্যক্তি বা তাদের সন্তান পার্টনারের (স্বামী বা স্ত্রীর) সম্পত্তি, ভরণপোষণ ইত্যাদি পাবেন না।

খ্রিষ্ট ধর্মের ক্ষেত্রে:

খ্রিষ্ট ধর্মের ক্ষেত্রেও ইসলাম ধর্মের মত। অন্য পক্ষ খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করলে কোনো সমস্যাই নেই। তবে অন্য পক্ষ খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ না করলে খ্রিষ্টান পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিয়েটি ‘অনিয়মিত’ বিয়ে হবে।

হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে:

এমন কোন বিশেষ নিয়ম নেই।

বিশেষ বিয়ে: বিশেষ বিবাহ আইন।

ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিয়ে এবং বিশেষ বিবাহ আইন।
ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিয়ে এবং বিশেষ বিবাহ আইন।

বিশেষ বিবাহ কি?

যখন সাধারণ ভাবে ব্যক্তিগত ধর্ম মেনে বিয়ে না করে বিশেষ আইন মেনে বিবাহ করা হয় তাই হচ্ছে বিশেষ বিবাহ।

স্বাভাবিক ভাবেই কেউ তার ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্মের অনুসারী হতে চায় না। তাই সব ধর্মের সাধারণ নিয়ম দুই ধর্মের মানুষের বিয়ে এই আইনগত তথা সামাজিক সমস্যা সমাধান করতে পারে না। তাই ১৯৭২ সালে এই একটি বিশেষ আইন “বিশেষ বিবাহ আইন ১৯৭২” এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করে। দুজন আলাদা ধর্মের মানুষ এই আইনের নিয়ম মেনে আইনগত ভাবে বিয়ে করতে পারে।

বিশেষ বিবাহ আইনে শর্ত:

বিশেষ বিবাহ আইনের মাধ্যমে বিয়ে করতে হলে কিছু বিষয় মেনে নিয়ে ও শর্ত পূরণ করে তবেই করতে হবে। শর্তগুলো নিন্মরূপ:

  • দুই পক্ষকেই আলাদা ভাবে ধর্ম ত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে । এই ঘোষণা এভিডেভিটের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে এবং তা সরকারি রেকর্ডভুক্ত হবে।
  • বিয়ের সময় বিয়ের পক্ষগণের মধ্যে কারোই কোনো জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকতে পারবে না, অর্থাৎ, স্বামী বা স্ত্রী থাকা অবস্থায় কেউই বিশেষ বিবাহ আইনের অধীন বিশেষ বিবাহ করতে পারবে না। (ধারা, ২)
  • বিবাহ ইচ্ছুক পুরুষ ব্যক্তির বয়স গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ১৮ বছর এবং মহিলার বয়স ১৪ বছর পূর্ণ হতে হবে। (ধারা, ২)
  • পক্ষগণ রক্ত সম্পর্কে বা বৈবাহিক সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত হতে পারবেন না, যাতে তাদের একজনের ওপর প্রযোজ্য আইন দ্বারা ওই বিবাহ অবৈধ হতে পারে। (ধারা, ২)

যেভাবে এই বিয়ে করতে হবে (প্রক্রিয়া):

  • প্রথমে, দুই পক্ষকেই আলাদা ভাবে এই ঘোষণা দিতে হবে যে “আমি …. খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্ম অনুসরণ / ধারণ করি না (profess)” এই ঘোষণাকে ধর্ম ত্যাগের ঘোষণাও বলা হয় । [তবে আমি মনে করি এর শব্দ চয়নে ও বিশ্লেষণে এর ব্যতিক্রম ভাবারও অবকাশ আছে।] এবং এই ঘোষণার কারণে এই আইনটি একটি ত্রুটিযুক্ত আইন। এই ঘোষণা এভিডেভিটের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে এবং তা সরকারি রেকর্ডভুক্ত হবে।
  • এবারে বিশেষ বিবাহ আইনের আওতায় রেজিস্ট্রেশন করতে পারে এমন একজনের কাছে যেতে হবে। আমার জানামতে এমন বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান ই আছে: যা সদরঘাট ও কোতোয়ালি থানার উত্তরে এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুল সংলগ্ন পাটুয়াটুলী রোডের ২-৪ লয়াল স্ট্রিটে, বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজ কার্যালয়ে দেশের একমাত্র সিভিল ম্যারেজ রেজিস্টার রেভারেন্ড ছিলেন প্রাণেশ সমাদ্দার নামের একজন তবে এখন তাঁর অবর্তমানে এখন অন্য একজন একই জায়গায় এই কাজ করছেন।
  • নিবন্ধকের কাছে গিয়ে প্রথমে তাদের বিয়ের ইচ্ছে পোষণ করে একটি নোটিশ দিতে হবে। এই নোটিশটি দেওয়া হয় যাতে করে নিবন্ধক উপরে উল্লেখিত বিষয় সম্পর্কে (যেমন, বর্তামান বৈবাহিক অবস্থা, নিষিদ্ধ সম্পর্ক, বয়স, ঘোষণা) ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়জনীয় খোজ খবর নিতে পারেন অথবা অন্য কেউ এই বিয়ের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গের কারণে দাবি তুলতে পারেন যদি কোন শর্ত ভঙ্গ তারে চোখে না পরে তবে তিনি বিয়ে ১৪ দিন পরে বিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন। (ধারা ৬)
  • এই ১৪ দিনের মধ্যে অথবা এখতিয়ার সম্পন্ন দেওয়ানী আদালতের ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে যেই ব্যক্তি শর্ত লঙ্ঘনের দাবি করেছেন সে আদালতের কাছে যাবে এবং এই বিয়ে যাতে না হতে পারে সেই মর্মে একটি ঘোষণা চাইবে।
  • এমন ঘোষণা পেলে রেজিস্টার সাহেব আর বিবাহ নিবন্ধন করতে পারবেন না। আর যদি আদালত তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে বা বাতিল করে তবে বিবাহ নিবন্ধনে কোন বাধা থাকবে না। (ধারা , ৭+৮)
  • আদালত যদি দেখেন যে অসৎ উদ্দেশ্যে উক্ত ঘোসনাটি চাওয়া হয়েছে তবে সেই ব্যক্তি ১০০০ টাকা জরিমানা করতে পারেন।

নিবন্ধনের / বিয়ের সময়

  • উভয় পক্ষের বয়স যদি ২১ বছর বা তার বেশী হয়ে থাকে তবে তবে তার নিজেই বিবাহ নিবন্ধনে সাক্ষর করবেন। যদি কারো বয়স ২১ বছরের কম হয়ে থাকে তবে তার বা তাদের অভিভাবকের মত লাগবে এবং সাক্ষর লাগবে। (ধারা, ২(৩))
  • লাগবে তাদের জাতীয় পরিচয় পত্র বিদেশি হলে পাসপোর্ট, ৪ কপি সত্য তোলা ছবি।
  • ৩ জন সাক্ষী।
  • পক্ষগণকে রেজিস্টার ও সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে বলতে হবে ‘আমরা পরস্পর পরস্পরকে আইনসংগত স্ত্রী অথবা স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম।’ [বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন না করলে বিয়েটি বাতিল হয়ে যাবে। ১১ ধারার বিধানাবলী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে [১৮ ডিএলআর (১৯৬৬) পাতা ৫০৯]।
  • বিয়ে সম্পাদনের পর নিবন্ধক ‘বিবাহ প্রত্যয়ন বই’য়ে প্রত্যয়ন পত্র অন্তর্ভুক্ত করবেন, যা নির্ধারিত একটি ফরম। এবং এটি উভয় পক্ষ ও তিনজন সাক্ষী কর্তৃক স্বাক্ষরিত হবে।
  • এছাড়ও এইসব পক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সরকার প্রদত্ত ফি প্রদান করতে হবে।
  • নিবন্ধক সরকার-নির্ধারিত ফরমে ‘বিবাহ প্রত্যয়ন বই’য়ে লিপিবদ্ধ সব অন্তর্ভুক্তির অনুলিপি তাঁর জেলার ‘জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ের রেজিস্টার জেনারেল’-এর কাছে পাঠাবেন। এবং এভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হবে ও তারা বিবাহের সনদ পাবেন।

সর্তকতা:

অনেক সময় বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে করার পরও হয়তো কোন পক্ষে আত্মীয় স্বজন ঝামেলা করতে চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে এই ঝামেলা থেকে বাচতে বিয়ের আগেই একটি জিডি করে রাখা যেতে পারে এবং বিয়ের পরে একটি হলফনামা বা কোর্ট ম্যারেজ করে রাখো যেতে পারে।

বিশেষ বিবাহের আইনে বিয়ের ফল:

উত্তরাধিকার: এই বিয়ের ফলে যে সন্তান জন্ম নেবে তাদের জন্য Succession Act, 1925 প্রযোজ্য হবে।
বিবাহ বিচ্ছেদ: এই আইনের অধীনে যারা বিয়ে করবেন তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য THE DIVORCE ACT, 1869  প্রযোজ্য হবে।
দত্তক নেওয়া: এই আইনের অধীনে যারা বিয়ে করবেন তারা সন্তান দত্তক নিতে পারবেন না।
এই আইনের অধীনে যদি কোন হিন্দু, বোদ্ধ, শিখ পিতার একমাত্র পুত্র বিয়ে করে তবে সেই পিতা সন্তান দত্তক নিতে পারবেন।

বিশেষ বিবাহ আইনের সমস্যা ও বিশেষ সতর্কতা:

এই আইনের মাধ্যমে যেহেতু দুজন বিপরীত লিংগের ও বিপরীত ধর্মের ব্যক্তি তাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিয়ে করে তারা তাদের আগের ধর্মের কোন সুযোগ সুবিধা আর পাবে না। আমারা জনি উত্তরাধিকার, সম্পত্তি , দান ইত্যাদির জন্য ব্যক্তিগত আইন / ধর্ম ব্যবহার করা হয়। প্রায় সব ধর্মেই ধর্ম ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে এবং ধর্ম ত্যাগ করলে সেই সন্তান বা পরিবারের সদস্য আইনগত ভাবে তাদের কাছে মৃত ধরা হয়। তাই উক্ত ধর্ম ত্যাগী ব্যক্তি তার পিতা বা পরিবার থেকে পারিবারিক আইনর ভিত্তিকে কোন সম্পত্তি পাবে না এবং কোন ধর্মিয় আচার অনুষ্ঠানে আইনগত ভাবে তার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, আপনি সরকারি বে-সরকারি চাকরি বা অন্য কোন আইনি কাগজে ধর্মের যায়গায় কি লিখবেন তা এক গোলক ধাঁধা, যদি নিজের আগের ধর্মের নাম লেখেন তবে তা মিথ্যে বলে প্রমাণিত হবে এবং আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

এছাড়াও নানা আর্থ ও সামাজিক দিক বিবেচনা করাও জরুরি, যেমন সন্তানের প্রতিপালন, নিজেদের সংসারের নীতি ইত্যাদি।

পুরো আইনটি বিশ্লেষণ করলে বলা যায় এটি একটি বাতিলযোগ্য আইন তবু অনেকে বাধ্য হয়ে এই আইনকে মন্দের ভাল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। যদিও আমি মনের করি একজন ভাল কৌশলী ও সমাজের সমর্থনে অন্যগুলো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

আশাকরি এই বিশ্লেষণ কাজে লাগবে। এমন বিস্তারিত আরও লেখা চাইলে আমাদের অনুপ্রেরণা যোগান। আর আইন সাহায্যের জন্য আমরা তো আছি-ই।

Facebook Comments

Avatar

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: [email protected].com

You may also like...

1 Response

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: