এবরশন বা গর্ভপাত; আইন কি বলে এবং কিছু ভ্রান্ত ধারণা

ভয়ঙ্কর মন খারাপ নিয়ে লিখতে বসলাম। সকাল থেকে ভালই কাটছিল, ফেসবুকে ডুকে এক বন্ধুর শেয়ার করা ভিডিও দেখে অন্তরাত্মা কেপে উঠল; সদ্য জন্মান এক জীবিত মানব সন্তানকে টয়লেটের মলের মধ্যে কে বা কারা ফেলে রেখেছে আর মানুষ কান্না শুনতে পেয়ে উদ্ধার করছে। পুরো ভিডিওটা দেখার সাহস হয়নি আর যেটুকু দেখেছি তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিনা। গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলাম তা ফেলে এখন লিখতে বসলাম, মনে হলো কিছু কথা বলা দরকার মানব সন্তানদের কিছু কথা জানা দরকার। ইস্যুটা সেনসিটিভ জানি গালিও পড়বে অনেক তবু আমার বলা উচিত উঠতি মানবদের জানা উঠিত, মুরুব্বিদের ভাবা উচিৎ।

আইনজ্ঞ হিসেবে হোক বা মনোবিজ্ঞান বা দর্শনের ছাত্র হিসেবে হোক কোন বিষয় শুধু সহজ ও সাধারণ ভাবে চিন্তা করা আমার কাজ নয় এবং উচিৎও নয়। অনেক কিছুই হতে পারে এই অমানবিক কাজের পিছনের ঘটনা তাই শুধু দোষ দিয়ে বা গালাগাল দিয়েই ক্ষান্ত হলে এমন দৃশ্য আমাদের আরও দেখতে হবে। তাই চলুন আমরা কি হতে পারে তাই নিয়ে একটু ভাবি এবং কি করা যেত তাই নিয়ে একটু ভাবি। ভাবি সমাজ কি বলে, জানি চিকিৎসা বিজ্ঞান কিভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারে, দেখি আইন কি বলে। কথা দিচ্ছি এই লেখা পড়লে আপনার কখনো বা কখনো কাজে লাগবে হয়তো এক বা একাধিক জীবনও বাচাতে পারবেন।

এবরশন বা গর্ভপাত নিয়ে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারনা। আছে আইন কানুণের ব্যক্ষার ব্যাপার বা সঠিক তথ্য জানা ও ব্যবস্থা করার বিষয়।

এই লেখায় আমার কথা গুলো কোন এক সময় এই সংক্রান্ত আইন বিষয়ক গবেষণায় আমি জানতে পেরেছি, এ জন্য আইনি বিষয়ে অনুসন্ধান করেছি, ডাক্তারদের সাথে ও ক্লিনিক গুলোতে গিয়ে কথা বলেছি, এমন সমস্যায় পড়া মানুষের কেস স্টাডি করেছি; তাই চলুন এক এক করে দেখি এবং সমাধান খুঁজি।

  • চলুন প্রথমে সমাজের রসালো ধারনাটাই আগে ধরে নেই, এই বাচ্চা এক অবাধ ফুর্তির ফল। অথবা
  • মেয়েটি রেপ ভিক্টিম।
  • মেয়েটি অ-প্রাপ্ত বয়স্ক এবং পরিবারের লোকজন দ্বারা এবইউজের স্বীকার।
  • মেয়েটির সাথে তার প্রেমিক প্রতারণা করেছে।
  • যে কাড়নেই হোক মেয়েটির পরিবার সন্তানটি চায়নি এবং তার অজান্তেই বাচ্চাটিকে ফেলে গেছে।

প্রথমত, আমাদের দেশে সেক্স এডুকেশন বলে কিছুই নেই তাই সাধারণত উঠতি ছেলে মেয়েরা অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তাই প্রথম পিরিয়ড পরেই মা বা মাতৃস্থানীয়াদের উচিৎ মেয়েদের মিনিষ্ট্রিয়াল সাইকেল সম্পর্কে পূর্ণ ধারনা দেওয়া এবং কি ভাবে কি হয় তা বলা। কোন কাড়নে মিনিষ্ট্রিয়াল সাইকেল মিস করলে তা যে দ্রুত অভিভাবককে নির্ভয়ে জানানো হয় সে ভাবে অশ্বত্ব করা।

নিরাপদ মিলনের ব্যাপারে আজকাল সবাই জানে তবু যদি কখনো অনিরাপদ মিলন হয় সে যে ভাবেই হোক ১২-২৪ ঘণ্টা মেয়াদি অনেক ইমার্জেন্সি পিল পাওয়া যায় তা গ্রহণ করা যেতে পারে, এটা এক সাথে দুটো কেনা ভাল কারণ কোন কারণে পিল খাওয়ার ২-৩ ঘনটার মধ্যে যদি বমি হয় তবে ব্যাকআপটা খেতে হবে যাতে করে কোন রিস্ক না থাকে। (খরচ ১০-২০০ টাকা)

এখন যদি উপরের বিষয় কেউ না মানেন বা মিনিষ্ট্রিয়াল সাইকেলের ব্যাপারটি ভুল বোঝার করনে কনসিভ করে থাকেন তখনি আসলে মানুষ ভয় পেয়ে যান এরা প্রধান কারণ এ সমাজের দায়িত্বহীনতা ও প্রচণ্ড অজ্ঞতা, এই প্রচণ্ড অজ্ঞতা বলছি এই করনে আমাদের অধিকাংশ সুশিক্ষিত উকিল এবং ডাক্তার সমাজ সহসাই এ বিষয়ে উল্টো পরামর্শ দেন এবং সে কাড়নেই আমার এত কিছু লিখতে হচ্ছে!

আপনি এই ধারণের সমস্যায় পড়লে হোন বিবাহিত বা অবিবাহিত, প্রথমেই শুনতে হবে এখনতো এবরশন করতে হবে, এটা তো কেউ করাবে না কাড়ন এটা বে-আইনে করলে জেল হবে! আর সামাজিক তিরস্কার আর ধর্ম জ্ঞান তো আছেই। কথাটি মিথ্যে নয় তবে স্বল্প জ্ঞানের কাড়নে এর ব্যাখ্যাটি সঠিক নয়।

এবরশন বা গর্ভপাত আইন

ছবি: এবরশন বা গর্ভপাত ; আইন কি বলে?

আইন

আমাদের পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ধারা ৩১২ অনুযায়ী কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্যে গর্ভপাত করা তবে তার ৩ বছর পর্যন্ত জেল এবং সাথে অর্থ দণ্ড হতে পারে আর যদি একই করানে মায়েরো মৃত্যু হয় তবে ৭ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। আবার অন্যদিকে যদি সেটা সেই মায়ের ইচ্ছে অনুসারে না হয় তবে ১০ থেকে যাবজ্জীবন জেল হতে পারে। এই দণ্ড যারা সহযোগিতা করবেন তাদেরও হতে পারে।

তবে, এই আইনে আরও বলা আছে যদি এমন কোন অবস্থা হয় যে মায়ের জীবন বাচাতে বা সুস্থতার কথা চিন্তা অথবা বাচ্চার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে ডাক্তারের পরামর্শক্রমে গর্ভপাত করানো যেতে পারে। ধরুন মা এই বাচ্চা নিলে আর সুস্থ থাকবেন না বা তার মৃত্যু হতে পারে বা বাচ্চাটি হয়তো বাঁচানো যাবে না বা বিকলঙ্গতা বা মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি থাকে এমন ধরনের অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শে গর্ভপাত করানো যাবে।

এইবার আসি আইনি ফাঁক-ফেঁকোরে গর্ভধারণের কতদিন পর ফিটাসের কোন অবস্থাকে বাচ্চা বা মানুষ হিসেবে ধারা হয় তা এই আইনে স্পষ্ট করে বলা নেই। এ নিয়ে আইনি বিতর্ক আছে এবং অনেক কথা বলা যায় তবে যেহেতু এই লেখা সাধারণের জন্য তাই আরে সেদিকে গেলাম না। তবে এটুকু জেনে রাখুন মাসিক বন্ধ হওয়ার পরপর-ই সেটাকে ঠিক পূর্ণ মানবের কাতারে ফেলা যায় না সেটা সাধারণত ধরা হয় ৩-৪ মাস পরে। তাই এর মধ্যে কোন মেডিকেল পক্রিয়ায় যেতে আইনি বাধা নেই।

দুর্ভাগ্যবশত ব্রিটিশদের করে যাওয়া আইন আমরা আর পরিবর্তন করিনি যেখানে তারা তাদের প্রায় সকল আইন নতুন করে তৈরি করেছে তবে বিষয়টি সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৯৭৯ পরিষ্কার করা হয়েছে। (পিডিএফ ফাইলের ৫৫-৫৬ পাতা দেখুন নিচে সংযুক্ত লিংক থেকে)

এবার আশা করি কিছু মানুষকে আইনি বিষয়ে ভুলটা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু তবুও এ সমাজের প্রথা বিরুদ্ধে কছু করতে গেলে অনেক সমস্যা কাড়ন আপনার জীবনের অবস্থা বোঝার ইচ্ছে কারো নেই বরং কারে উপর হাসতেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। হতে পারে যে সমস্যায় পড়েছে তার বা তাদের পারিবারিক অবস্থা খুব খারাপ, হতে পারে এটা একটা ভুল, হতে পারে তার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা হয়নি, হতে পারে তাদের বিয়ে হয়নি আবার হতে পারে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে সে যাই হোক যদি আমার একটা বাচ্চার কথা ভাবি তার ভবিষ্যৎ যদি এই ড্রেনে বা অবহেলায় না দেখতে চাই তবে আমাদের বোধয় অতি আবেগী না হয়ে বাস্তবতায় পদার্পণ করা উচিৎ এবং তাদের সহযোগিতা না করি তার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। একটি বাচ্চা একটি মানুষ একটি ভবিষ্যৎ। আর জারজ অবৈধ সন্তান বলে কিছু হয় না হয় মানব সন্তান তাদের বাবা মাকে যা খুশি ভাবুন সেটা আপনার বিষয় কিন্তু সন্তানটার কি দোষ কেন তাকে আমরা মানুষ হিসেবে দেখবো না। আর যতদিন এই মানুষিকটা আমরা পোষণ করবো ততদিন এমন ময়লায় পরে থাকা মানব সন্তান আমাদের দেখতে হবে।

সে যাই হোক এবার সংক্ষেপে কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাই বলি।এমন ভাবি মাসিক বন্ধ হলে যেই পক্রিয়াটিতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা গ্রহণ করেন তাক বলে মিনেট্রিয়াল রেগুলেশন অর্থাৎ তার বন্ধ হওয়া মাসিকটাকে আবার সময়মত সচল করার ব্যবস্থা করেন। এটি দুটি মাধ্যমে করা যায়, তবে ডাক্তার কিছু টেস্ট নিশ্চিত হবার জন্য কিছু টেস্ট দেবেন। যার বেসরকারী খরচ পড়তে পারে ৩-৫ হাজার টাক।

১) ঔষধের মাধ্যমে যার বেসরকারি খরচ প্রায় ২৫০০-৩০০০ টাকা, এর ফলে প্রায় দুই সপ্তাহ মাসিক সচল থেকে ফিটাসটি স্বাভাবিক পক্রিয়ায় বের হয়ে যাবে।

২) এম আর/ ডি এম সি এটিতে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ছোট্ট একটি অপারেশনের মাধ্যমে ফিটাসটি বের করে আনা হবে। এটি ঘন্টখানেকের একটি ছোট্ট অপারেশন যার খরচ পরতে পারে বেসরকারি প্রায় ৩০০০ থেকে ৭০০০ টাকা।

এই প্রসিডিউরের সাকসেস রেট ৯৫-৯৯% তবে এটা মনে রাখতে হবে সব ডাক্তাররা স্বভাবতই এই প্রসিডিউরে যেতে চান না বিশেষত যখন বাচ্চাটি প্রথম সন্তান/ গর্ভধারণ এতে পরবর্তী বাচ্চা কিছুটা জটিলতা হতে পারে সেটা প্রায় ৫-১০%।

এবার আসি কোথায় এবং কিভাবে।

এসব বিষয়ে সঠিক স্থান নির্বাচন করা খুবই জরুরী কারন সবাই এই সেবা প্রদান করে না উপরুন্ত বিব্রত করতে পারে।

  • কোন ক্যজুয়ালটি কেস হলে (রেপ বা অন্য কিছু) সরকারের বিভিন্ন ওয়ান স্টপ সার্ভিস আছে সেখান থেকে বিনা মূল্যে করতে পারবেন।
  • প্রতিটি জেলার সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে এই সেবা পাবেন তা ছাড়াও এনজিও ও বিশেষ ভাবে মাতৃ সেবা বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সেবা দেয় এমন হাসপাতাল গুলোতে এই সেবা পাবেন।
  • এটি একটি বৈধ এবং জন্মনিয়ন্ত্রেনের গাইড লাইনে হিসেবে সরকার দ্বারা নির্দেশিত

o          তাই আপনার বিয়ে বা ব্যক্তিগত বিষয় তাদেরকে জানাতে আপনি বাধ্য নন এবং তারাও প্রশ্ন করতে পারে না (যদিও সরকারি হাসপাতালে কতদূর তা ফলো করা হয় আমি নিশ্চিত নাই)

o          আপনাকে বিবাহিত হতে হবে বা স্বামীর দরকার হবে এমন কোন কথা নেই।

  • এই সেবা নেওয়া পর আপনাকে ১ মাস ডাক্তারের কিছু নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

তাই আপনি নিভয়ে সেবা নিতে পারেন। ২০১০ সালে প্রায় ৬লক্ষ ৫৩ হাজার জন এই সেবা নিয়েছেন। অন্যদিকে অজ্ঞতার করনে এমন কেসও আছে যেখানে মেয়েরা আত্ম হত্যা করছে, পালিয়ে যাচ্ছে বা নিজের অঙ্গহানি করে গর্ভপাত করার চেষ্টা করছে এমন ফলের চেয়ে কি সঠিক পথে এগুনো ভাল নয়?

আসুন সঠিক পথ দেখিয়ে একটু সুস্থ সমাজে বাস করি।

আরে  বিস্তারিত জনুন এই লিংক থেকে

Facebook Comments

Avatar

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: [email protected]

You may also like...

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: