ধর্ষণের আইনগত ব্যাখ্যা বাংলাদেশ দন্ডবিধি অনুসারে সংজ্ঞা ও প্রতিকার

বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৫ নং ধারা অনুযায়ী; কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাত্ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে ।

এখানে উল্লেখ্য যে, অনুপ্রবেশই নারী ধর্ষণের অপরাধ রূপে গণ্য  হবার যোগ্য যৌনসহবাস অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) – এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধের যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো:  ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডের বিধান৷ একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে উক্ত দলের সকলের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ দশ বছর এবং সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেরও বিধান । কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেওদন্ডিত হবেন।

Rape-Crime-in-Sweden[1]পুলিশ হেফাজতে কোনো নারী বা শিশু ধর্ষিত হলে যাদের হেফাজতে থাকাকালে এ ধর্ষণ সংগঠিত হয়েছে তারা সকলেই নারী ও শিশুর হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য সর্বোচ্চ দশ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। ধর্ষণকারী এক বা একাধিক ব্যক্তি হতে পারে৷ আবার ধর্ষণ না করেও কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের ঘটনায় সাহায্য করতে পারে৷ সবক্ষেত্রে প্রত্যেকেই সমানভাবে দায়ী হবে এবং শাস্তি লাভ করবে। বিচারক শাস্তির পরিমাণ ঠিক করেন অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে। মামলার বিষয়বস্তু (ধর্ষণের শিকার নারীর জবানবন্দি, ডাক্তারী পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য সাক্ষ্য) পর্যালোচনা করে নিজস্ব বিচার- বিবেচনার ভিত্তিতে বিচারক রায় দেন এবং অপরাধীর শাস্তি নির্ধারণ করেন।

img-offering-false-evidence

ধর্ষণের পর ধর্ষিত নারীর করণীয় বিষয়গুলো কি কি প্রমাণ বা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করতে হবে ধর্ষণের ঘটনাটি দ্রুত কাছের কাউকে জানান৷ কারণ তিনি আপনাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবেন এবং মামলার সময় সাক্ষ্য দিবেন। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ষণের শিকার নারীর শরীর৷ এরজন্য ধর্ষণের ঘটনার পর যে অবস্থায় আছেন তেমনি থাকুন, নিজেকে পরিষ্কার বা গোসল করবেন না। কারণ ধর্ষণকারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর শরীরে কিছু প্রমাণ চিহ্ন রেখে যায়। ডাক্তারী পরীক্ষার দ্বারা নারীর শরীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য- প্রমাণাদি এবং আলামত সংগ্রহ করা যায়, যা ধর্ষণ প্রমাণ ও ধর্ষণকারীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।ঘটনার সময় যে কাপড় গায়ে ছিলো অবশ্যই সংরক্ষণ করবেন৷ কাগজের ব্যাগে করে এই কাপড় রেখে দিন৷ কাপড়ে রক্ত, বীর্য ইত্যাদি লেগে থাকলে তা যদি ধর্ষণকারীর রক্ত বা বীর্যের সাথে মিলে যায়, তাহলে মামলায় এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে কাজ করে ।

দ্রুত থানায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার নিকটবর্তী থানায় এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করুন৷ যদি সম্ভব হয় তবে একজন আইনজীবীকে সাথে নিতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে চেষ্টা করুন। ঘটনার সময়ের আপনার পরিধেয় কাপড় ও অন্যান্য সাক্ষ্য সাথে রাখুন। কারণ এসবই পুলিশ অফিসারের তদন্তের সময় কাজে লাগবে৷ আপনি চাইলে ঘটনা সম্পর্কে মহিলা পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করেত পারেন। থানায় অভিযোগ দায়েরের পর যদি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহন না করেন তবে অতিদ্রুত পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ( এস.পি অথবা ডি.সি ) কে লিখিত ভাবে অবহিত করুন। ঘটনার দিনের মধ্যে যদি তারাও কোন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন না করে তাহলে পরের দিন অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করুন। এ ব্যাপারে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্থ নারী নয়, তার পক্ষ থেকে যে কেউই (যিনি অপরাধ সম্পর্কে জানেন ) এ অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনি যত তাড়াতাড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন, তত তাড়াতাড়ি পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে চিকিত্সকের কাছে নিয়ে যাবেন। কারণ ধর্ষণের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারী পরীক্ষা না করালে ধর্ষণের প্রমান পাওয়া যায় না। ডাক্তারী পরীক্ষা সরকারী হাসপাতালে বা সরকার  কর্তৃক এই ধরনের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোন বেসরকারী হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাবে। ডাক্তারী পরীক্ষা হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার অতিদ্রুত সম্পন্ন করবেন এবং ডাক্তারী পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদান করবেন৷

ডাক্তারী রিপোর্ট দ্রুত হাতে পেলে পুলিশ দ্রুত ঘটনার তদন্ত শুরু করতে পারবেন। চিকিত্সককে সব কথা খুলে বলতে হবে দ্বিধা না করে চিকিত্সক যা যা জানতে চাইবেন তার সঠিক জবাব দিন৷ কারণ আপনার কথার ওপর নির্ভর করে তিনি আপনাকে সাহায্য ও সেবা দেওয়ার চেষ্টা করবেন৷ আপনার মানসিক অবস্থার কথাও তাকে জানান। আপনার পরবর্তী মাসিক যদি সময় মত না হয় তবে সাথে সাথেই চিকিত্সকের সাথে দেখা করতে ভুলবেন না।

Facebook Comments

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: [email protected]

You may also like...

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: