সাকসেশন সার্টিফিকেট কি, কেন ও কীভাবে পাবেন?
সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate) কি?
সাকসেশন সার্টিফিকেট হচ্ছে একটি সনদ বা সার্টিফিকেট যা ্দেওয়ানি আদালত কর্তৃক Succession Act, 1925 (উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫) এর ৩৭২ ধারা অনুসারে প্রদান করা হয় এবং এই সনদের মাধ্যমে আদালত কোনো মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারগণ ঐ মৃত ব্যক্তির অস্থাবর সম্পত্তির কার কতটুকু অংশ তা নির্ধারণ করে দেন।
সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate) কখন ও কেন নিতে হয়?
মৃত ব্যক্তি যদি কোনো অস্থাবর সম্পত্তি (Movable Assets) রেখে মারা যান, যেমন: ব্যাংক একাউন্টে থাকা টাকা, ডিপিএস, পেনশন, কোম্পানিতে শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, বন্ড বা ইন্সুরেন্সের টাকা ইত্যাদি এবং যাদের কাছে ঐ অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে তারা যদি নিজেদের দায়মুক্তির জন্য এই বিষয়ে সুনিশ্চিত হতে চান যে ঐ মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী কে কে আছেন এবং তাদের মধ্যে ঐ সম্পদ কীভাবে ভাগ করবেন; তখন তারা একটি সাকসেশন সার্টিফিকেট উত্তরাধিকারীদের নিকট চাইতে পারেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সাকসেশন সার্টিফিকেট চান। তখন সাকসেশন সার্টিফিকেট আদালত থেকে গ্রহণ করতে হয়।

ওয়ারিশান সনদ থাকার পরও কেন সাকসেশন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়?
ওয়ারিশান সনদ বা ওয়ারিশ সনদ প্রদান করা হয় স্থানীয় সরকার দ্বারা; যেমন- সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ। এরা নিতান্তই কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার করেন, এরা আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ হন না। তাই ব্যক্তিগত আইন (যার যার ধর্ম অনুসারে) সম্পর্কে তারা কম জানেন, উত্তরাধিকারের সম্পর্ক তারা কম বোঝেন। তারা এই সনদ প্রদান করতে পারেন যে কোনো মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার কে কে আছেন, কিন্তু এটা নির্ণয় করতে পারেন না তাদের সম্পত্তির অংশ কত হবে। আবার, মৃত ব্যক্তির বিভিন্ন দেনা-পাওনা, অসিয়ত (Will), দান ইত্যাদি থাকতে পারে; যার কিছু আইনি দিক বিবেচনায় আনতে হয়, যার সক্ষমতা স্থানীয় সরকারের নেই।
অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তির পাওনা আদায়ে প্রতিনিধি প্রমাণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে সাকসেশন আইন ১৯২৫ এর ২১৪ ধারায়; যেখানে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর যদি অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে তার টাকা-পয়সা পাওনা থাকে কিংবা ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত থাকে, তবে শুধু “আমি তার ওয়ারিশ” দাবি করলেই আদালত সেই টাকা আদায়ের রায় দেবেন না বা পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা করবেন না। আদালত পাওনা আদায়ের রায় দেওয়া বা কার্যকর করার আগে দাবিদারকে একটি আইনি সনদ জমা দিতে হবে। আর এই সনদই হচ্ছে সাকসেশন সার্টিফিকেট!
একই সাথে এই আইনের ৩৮১ ধারায় সাকসেশন সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের (যেমন: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান) আইনি দায়মুক্তি (Indemnity) সুনিশ্চিত করা হয়েছে। যার ফলে উক্ত প্রতিষ্ঠান সবসময় মৃত ব্যক্তির অর্থ উত্তরাধিকারীদের পরিশোধের আগে একটি সাকসেশন সার্টিফিকেট চেয়ে থাকে।
আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেটের জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয়?
প্রথমে দেখতে হবে মৃত ব্যক্তি কোন এলাকায় বাস করতেন অথবা তার যেই অস্থাবর সম্পদ আপনি পেতে চাচ্ছেন তার মালিক বা ঐ অস্থাবর সম্পত্তির অবস্থান কোথায়। তারপর সেই এলাকা যেই দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারে পড়ে, যার সাকসেশন মোকদ্দমা শোনার এখতিয়ার আছে, সেই আদালতে মোকদ্দমাটি দায়ের করতে হবে।
সাকসেশন সার্টিফিকেট প্রদান সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় Succession Act, 1925 (উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫) দ্বারা পরিচালিত হয়। এই আইনের ধারা ৩৭১ থেকে ৩৯০ পর্যন্ত সাকসেশন সার্টিফিকেটের আবেদন, প্রক্রিয়া, এখতিয়ার এবং কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মূলত Succession Act, 1925 (উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫) এর ধারা ৩৭২ অনুযায়ী সাকসেশন সার্টিফিকেটের আবেদন করা হয়। এটা মূলত একটি “বিবিধ মামলা” বা “Misc. Case” হিসেবে দায়ের করা হয়। এই মোকদ্দমাকে আবার ‘Act 39 Case’ বা ‘Act XXXIX Case’ও বলা হয়ে থাকে।
মৃত ব্যক্তির যেকোনো উত্তরাধিকারী এই মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। সব উত্তরাধিকারীরা একসাথে করতে পারেন, সবাই একজনকে ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন, আবার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেউ আবেদন না করলে বা আবেদনে সম্মতি প্রদান না করলে বা তার কোনো ধরনের আপত্তি থাকলে তাকে বিবাদী করে মোকদ্দমা করতে পারেন। যদি সবাই বাদী হয়ে একজনকে ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে ক্ষমতাগ্রহণকৃত ব্যক্তি হলফমূলে মোকদ্দমাটি দায়ের করবেন। এটি একটি আবেদন আকারে আদালতে জমা হবে এবং আদালত গ্রহণ করলে মিস কেস হিসেবে গণ্য হবে।
এখন যদি কোনো বিবাদী না থাকে তবে সকল বাদীকে সমন প্রদান করা হবে, তারা আদালতে একদিন এসে সম্পর্ক ও মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে আদালতের প্রশ্নের জবাব দেবেন এবং উক্ত আবেদনে সম্মতি প্রদান করবেন। বিজ্ঞ আদালত তারপর পরবর্তী নির্ধারিত তারিখে সার্টিফিকেট প্রদানের আদেশ প্রদান করবেন।
আর যদি উত্তরাধিকারীগণের কেউ পক্ষভুক্ত না হন এবং আপত্তি থাকে, তবে তার কাছে সমন যাবে। যখন তিনি আসবেন তখন এটি একটি পূর্ণ দেওয়ানি মোকদ্দমায় রূপ নেবে, তখন এটাকে বলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মোকদ্দমা বা Contested Suit। এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি একটু লম্বা হবে এবং নিচের মতো হবে:
- সমন ও আপত্তির সুযোগ: বিবাদী ওয়ারিশদের কাছে আদালত থেকে আইনি সমন যাবে।
- লিখিত জবাব (Objection): সমন পাওয়ার পর কারো আপত্তি থাকলে তারা দেড় (১.৫) মাসের মধ্যে আদালতে লিখিত জবাব বা আপত্তি জমা দিতে পারবেন।
- আপত্তি শুনানি: নির্ধারিত দিনে কেউ আপত্তি না জানালে এবং নথি সঠিক থাকলে বিচারক চূড়ান্ত শুনানির দিন ধার্য করেন।
- সাক্ষ্য গ্রহণ: আবেদনকারী ও অন্য কোনো ওয়ারিশের সাক্ষ্য নেওয়া হয় এবং ডকুমেন্টস যাচাই করা হয়।
- আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করবেন এবং তারপর সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। যদি বাদীর পক্ষে আসে তবে সার্টিফিকেট প্রদানের আদেশ দেবেন, অন্যথায় দেবেন না।
এই বিষয়গুলো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শক্রমে একজন আইনজীবী নিয়োগ করেই করতে হবে, নিজে নিজে করা যাবে না।
সাকসেশন সার্টিফিকেটের আবেদন করতে কি কি কাগজপত্র লাগে?
১. মৃত্যু সনদ (Death Certificate): মৃতের ইউপি/সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত ডিজিটাল মৃত্যু সনদ।
২. ওয়ারিশান সনদ: স্থানীয় চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর কর্তৃক ইস্যুকৃত মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ তালিকা (বাধ্যতামূলক নয়)।
৩. আবেদনকারী ও সকল ওয়ারিশের পরিচয়পত্র: এনআইডি (NID), জন্ম নিবন্ধন বা পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি।
৪. সম্পত্তির প্রমাণপত্র: ব্যাংকের স্টেটমেন্ট, ডিপিএস/সঞ্চয়পত্রের কপি, শেয়ার সার্টিফিকেট বা বন্ডের কপি (যেখানে একাউন্ট নম্বর ও টাকার পরিমাণ স্পষ্ট উল্লেখ আছে) এবং ব্যাংক থেকে পাওয়া “নমিনেশন/ব্যালেন্স সার্টিফিকেট” (যদি থাকে)।
৫. নমিনেশনের তথ্য (যদি থাকে): মৃতের করা নমিনির কপি (তবে সাকসেশন সনদ সকল আইনি ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করে)।
সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে কত খরচ হয়?
খরচের হিসাবটা দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১। কোর্ট ফি: Court Fees Act, 1870 (Schedule I, Entry 11) অনুসারে সাকসেশন সার্টিফিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো:
- ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত: কোনো কোর্ট ফি লাগে না (০% / বিনামূল্যে)।
- ২০,০০০ টাকার বেশি কিন্তু ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত: মোট অর্থের ১% (এক শতাংশ)।
- ১,০০,০০০ টাকার বেশি: মোট অর্থের ২% (দুই শতাংশ)।
এই ফি মৃত ব্যক্তির ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা/সুদসহ পাওনা অথবা শেয়ার/সিকিউরিটির বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর হিসাব করা হয় এবং আদালত আদেশ প্রদান করার পর সরকারি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
২। আইনজীবীর খরচ ও প্রক্রিয়াগত খরচ: এটা কোন এলাকার আদালত ও আইনজীবীর অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবীদের মতামত গ্রহণ করতে আমাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে কত সময় লাগে?
- অবিরোধপূর্ণ (Uncontested): যদি সকল ওয়ারিশ একমত থাকেন এবং কেউ আপত্তি না জানায়, তবে সাধারণত ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।
- বিরোধ থাকলে (Contested): ওয়ারিশদের মধ্যে জটিলতা বা বিরোধ থাকলে মামলা নিষ্পত্তিতে ৬ মাস থেকে ১ বছর বা তার বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া ব্যাংক হিসাবের টাকা, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র, পেনশন বা শেয়ারের মতো অস্থাবর সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সাকসেশন সার্টিফিকেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক দলিল। ওয়ারিশান সনদ কেবল উত্তরাধিকারীদের তালিকা নির্ধারণ করলেও, কে কতটুকু অংশ পাবেন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে সাকসেশন সার্টিফিকেটের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক আইনি নিয়ম মেনে ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করলে খুব সহজেই আদালত থেকে এই সার্টিফিকেট গ্রহণ করা সম্ভব।
সাকসেশন সার্টিফিকেটের আবেদন, মিস কেস পরিচালনা কিংবা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যেকোনো জটিল আইনি পরামর্শ ও সহায়তার জন্য আমাদের অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
লেখক
মো: রায়হানুল ইসলাম
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
যোগাযোগ: ০১৭১১৩৮৬১৪৬