অথরাইজড ক্যাপিটাল বনাম পেইড আপ ক্যাপিটাল

একটি প্রাইভেট বা লিমিটেড কোম্পানি খুলতে গেলে বেশ কিছু বিষয় জেনে বুঝে তারপর আগাতে হয় তার মধ্যে প্রধান একটি বিষয় হচ্ছে কোম্পানির অথরাইজড ক্যাপিটাল এবং পেইড আপ ক্যাপিটাল কত হবে। Authorised Capital অর্থ হচ্ছে অননুমোদিত মূলধন আর Paid-up Capital অর্থ হচ্ছে পরিশোধিত মূলধন। চলুন এই দুটি বিষয় বুঝে নেই।

আমাদের কাছে যখন কোন ক্লায়েন্ট একটি কোম্পানি খুলতে আসেন, প্রথমে তার প্রশ্ন থাকে যে,  একটি কোম্পানি খুলতে কত টাকা লাগবে?

এখন এর উত্তরটা নির্ভর করে আপনার কোম্পানিটির অথরাইজড ক্যাপিটাল কত হবে তার উপরৰ।

 

তখন যে প্রশ্নগুলো আসে সেগুলো হচ্ছে:

 

  • অথরাইজড ক্যাপিটাল কি?
  • পেইড আপ ক্যাপিটাল কি?
  • অথরাইজড ক্যাপিটাল ও পেইড আপ ক্যাপিটাল বেশি বা কম হলে আমাদের সুবিধা অসুবিধা কি?
  • কিভাবে অথরাইজড ক্যাপিটাল ও পেইড আপ ক্যাপিটাল নির্ধারণ করব?  ইত্যাদি।

 

আমরা আজকে এই সব বিষয়ের উত্তর প্রদান করব।

আমাদের মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আপনাদেরকে অনুরোধ করবো কোম্পানির গঠন সম্পর্কিত আমাদের বাংলা লেখাটি পড়ে দেখবেন। তাছাড়া সম্যক ধারনা নেওয়ার জন্য এই ভিডিওটিও দেখতে পারেন।

প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির গঠন প্রক্রিয়া

 

 

 

চলুন আমাদের মুল আলোচনায় ব্যাক করা যাক। 

 

অথরাইজড ক্যাপিটাল ও পেইড আপ ক্যাপিটাল কি?

অথরাইজড ক্যাপিটালের বাংলা হচ্ছে অনুমোদিত মূলধন, অর্থাৎ যে  মূলধন আপনি বিনিয়োগ করার জন্য বা ইনভেস্ট করার জন্য সরকারের কাছে অনুমতি পেয়েছেন। অন্যদিকে পেইড আপ ক্যাপিটাল হচ্ছে যেই মূলধন যা আপনি আপনার কোম্পানি খোলার সময় বিনিয়োগ করছেন।

অথরাইজড ক্যাপিটাল বনাম পেইড আপ ক্যাপিটাল

উদাহরন

 

একটি উদাহরণ দিলে আপনাদের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

 

ধরুন আপনি গাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য একটি কোম্পানি খুলতে যাচ্ছেন সেখানে আপনি দুটি গাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করছেন যা পরবর্তীতে আপনি ১০০ গাড়িতে উন্নত করতে চাচ্ছেন।

 

 এখন ধরি, যে প্রতিটি গাড়ির মূল্য ১ লক্ষ টাকা।

 

এখন প্রতিটি গাড়ির মূল্য যদি ১ লক্ষ টাকা হয় প্রথম দুটি গাড়ি দিয়ে যখন আপনি আপনার কোম্পানিটি শুরু করতে চাচ্ছেন আপনাকে দুই লক্ষ টাকা ইনভেস্ট করতে হবে। এই যে আপনি ২ লক্ষ টাকা ইনভেস্ট করে কোম্পানিটি শুরু করলেন এটাই হচ্ছে আপনার পেইড-আপ ক্যাপিটাল।

 

এই দুই লক্ষ টাকা কোম্পানি নিবন্ধন করার পরে অতি দ্রুত ক্রস চেকের  মাধ্যমে কোম্পানির অংশীদাররা  ব্যাংকে জমা দিবেন এবং এই টাকা দিয়েই আপনার ঐ দুটি গাড়ি ক্রয় করতে হবে এবং আপনার ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং এই টাকাটা অবশ্যই আপনার কোম্পানির ব্যবসার কাজে  ব্যয় করতে হবে।

 

এখন আপনি চিন্তা করলেন যে আপনি ভবিষ্যতে ১০০  পর্যন্ত গাড়ী কিনবেন তাই  সরকার থেকে আগে থেকেই আপনার ১০০ টি গাড়ি কেনার জন্য যে বিনিয়োগ দরকার সেই বিনিয়োগ হিসাব করে অনুমতি নিতে হবে।  এই যে আপনাকে ১০০ টি গাড়ি কিনার জন্য ১০০ লক্ষ টাকা অর্থাৎ ১ কোটি টাকার অনুমতি দেওয়া হল এটি হচ্ছে অনুমোদিত মূলধন।

 

আপনার কোম্পানির শুরু করার সময় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে না কিন্তু আপনি ধীরে ধীরে এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবেন। 

 

শেয়ার বন্টন

 

আরও একটা জিনিস মনে রাখতে হবে সেটি হচ্ছে আপনার অথরাইজড ক্যাপিটালের প্রেক্ষিতে কিন্তু আপনার শেয়ার বণ্টন  হয়ে থাকে, সাধারণত আমরা প্রতিটি ১০০ টাকার শেয়ার হিসেবে অথরাইজড ক্যাপিটাল লেটার করে থাকি।  তাহলে আপনার ১ কোটি টাকার অথরাইজড ক্যাপিটাল শেয়ার হয় এক লক্ষ এবং আপনি প্রাথমিকভাবে ২ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে আপনি মাত্র ২,০০০ শেয়ারের জন্য বিনিয়োগ করলেন।  বাকি ৯৮,০০০ শেয়ার চাইলে আপনারা নিজেরা বিনিয়োগ করে নিতে পারেন অথবা প্রয়োজনে অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারেন। 

 

তবে মনে রাখবেন এটা কিন্তু কোম্পানির ব্যবসা করার জন্য কোন লিমিটেশন না আপনার কোম্পানি ২ লাখ টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল নিয়ে এবং এক কোটি টাকা অথরাইজড ক্যাপিটাল নিয়ে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করতে পারে এটা কোন সমস্যা না।

 

নির্ধারনের উপায়

 

এরপরে যে প্রশ্নটা আসে সেটা হচ্ছে যে অথরাইজড ক্যাপিটাল ক্যাপিটাল বেশি বা কম নিয়ে আমার সুবিধা অসুবিধা কি?

 

আপনি যদি অথরাইজড ক্যাপিটাল একটু বেশি নেন সেই ক্ষেত্রে আপনার বিজনেসে যখন অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হবে আপনি আপনার কোম্পানির অথরাইজড ক্যাপিটাল অনুসারে যে শেয়ারটা পাবেন সেই শেয়ারটা বিক্রি করে আপনি কোম্পানির জন্য বিনিয়োগ গ্রহণ করতে পারবেন।  

 

বর্তমান যুগে কেউ বিনামূল্যে অথবা বিনা লাভে কাউকে টাকা পয়সা ধার দেয় না।  আপনার কোম্পানির যদি কোন ইনভেস্ট প্রয়োজন হয় অথবা অনেক সময় দেখা যায় যে অল্প কোন ইনভেস্ট এর কারণে বড় একটি কাজ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বা কোম্পানির লসে পড়ার সম্ভাবনা হচ্ছে তখন আপনি আপনার কাছে পড়ে থাকা যে  অথরাইজড শেয়ার আছে আছে সেই শেয়ার  খুব সহজেই অন্য আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন।

 

অন্যদিকে চলুন দেখি পোইড-আপ ক্যাপিটাল বেশি বা কম নিয়ে কি লাভ।

 

প্রথমত আপনার কোম্পানিটি শুরু করতে  ও প্রাথমিকভাবে কিছুদিন পরিচালনা করতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় সেটা আপনার পোইড-আপ ক্যাপিটাল হওয়া উচিত অন্যথায় আপনার আয় ব্যয় হিসাব তাতে আপনার বেগ পেতে হবে এবং আপনি যখন বছর শেষে রিটার্ন জমা দিতে যাবেন,  ট্যাক্স ও ভ্যাট জমা দিতে যাবেন তখন আপনার ঝামেলা পোহাতে হতে পারে । 

 

আপনি যথাযথ ভাবে পোইড-আপ ক্যাপিটাল প্রদান না করলে আপনার বাইরে থেকে টাকা ধার নিতে হবে, যদি আপনার নিজের পকেটের টাকা থেকে থাকে তখন যদি আপনি বাইরে থেকে টাকা ধার নেয় সেটা একটা অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে আপনার উপর বর্তাবে।

 

তাছাড়াও এটা সবসময় মনে রাখতে হবে যে একজন ব্যবসায়ীর কিন্তু ঋণ প্রয়োজন হয় এবং ব্যাংক আপনাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে আপনাকে ঋণ দেবে কি দেবে না সেটা নির্ভর করবে আপনার ব্যাংকে কত টাকা আছে এবং আপনার ব্যাংকে কত টাকা ট্রানজেকশন হচ্ছে তার উপরে। এখন যদি আপনার কোম্পানির একাউন্টে কম ট্রান্সএকশন  থাকে তখন স্বভাবতই ব্যাংক আপনাকে খুব ভালো চোখে দেখবে না। তাই  একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রাথমিক ভাবে কিছুদিন পরিচালনা করতে যেয়ে টাকাটা প্রয়োজন হয় সেইটা পোইড-আপ ক্যাপিটাল হিসেবে ইনভেস্ট করে একটি কোম্পানির শুরু করা ভালো।

 

অন্যদিকে আপনার কোম্পানিটি আপনি ভবিষ্যতে কোথায় দেখতে চান আপনি কত টাকা ইনভেস্ট করতে চান আপনি কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করে অথরাইজড ক্যাপিটাল  নির্ধারণ করা উচিত।  আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আপনি ১০ বছর পরে আপনার কোম্পানিতে কোথায় দেখতে চান তার ওপর নির্ভর করে এখনি আপনার অথরাইজড ক্যাপিটাল ঠিক করে নেওয়া ভালো। অথরাইজড ক্যাপিটাল একটু বেশি করে নিলে ভবিষ্যতে আপনার কোম্পানির বিনিয়োগ পেতে আপনার জন্য সুবিধা হবে তাছাড়াও বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে গেলে তারা আপনাকে আপনার কোম্পানির অথরাইজড ক্যাপিটালের অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে পারে।  তাই অথরাইজড ক্যাপিটাল একটু বুঝে শুনে ঠিক করা উচিৎ।

 

আশাকরি বিষয়গুলো সহজে আপনাদের বুঝতে পেরেছি।  কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে কোন কিছু জানার থাকলে অথবা কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে অবশ্যই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন আপনাকে আপনার প্রয়োজন মত সেবা প্রদান করতে পারব। ধন্যবাদ।

বন্ধুদের জানান

ল হেল্প বিডি আইনের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সাধারণ ভাবে আইন নিয়ে আলোচনা করে। আইনের আশ্রয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীর পর্যাপ্ত গবেষণা ও কৌশল প্রয়োগ করেন যার ফলে তা সাধারণ আইনের ব্যতিক্রম হতে পারে, আমাদের লেখা এবং সাধারণ সাহায্য কোন আইনজীবীর বিকল্প নয়। প্রয়োজনে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।

আমাদের সেবা নিতে চাইলে ফর্ম, ই-মেইল lawhelpbd@gmail.com বা ফেসবুকের ম্যসেঞ্জারের মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: rayhan@lawhelpbd.com more at lawhelpbd.com/rayhanul-islam

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: দু:খিত এই লেখাটির মেধাসত্ত্ব সংরক্ষিত !!