আয়কর রিটার্নের জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন
বাংলাদেশে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সীমার উপরে আয়কারী নাগরিকদের জন্য ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন (Income Tax Return) জমা দেওয়া একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। তবে সঠিক তথ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে না রাখার কারণে অনেক করদাতাই শেষ সময়ে এসে বিড়ম্বনায় পড়েন। আপনি কি জানেন, সঠিক সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে গুনতে হতে পারে বড় অংকের জরিমানা? আজকে আমরা আলোচনা করব আয়কর জমা দিতে কি কি কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, আয়ের উৎস ভেদে নথিপত্রের ভিন্নতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় দেখানোর সঠিক নিয়ম। আপনি চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা প্রবাসী হোন না কেন, আমাদের এই সহজ নির্দেশিকাটি আপনাকে ঝামেলামুক্তভাবে কর প্রদানের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে।
আয়কর রিটার্ন জমা প্রদানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে একটি ই-টিন এর, যা আপনার মোবাইল নং এর মতই আয়কর প্রদানের জন্য একটি ইউনিক নম্বর। এটি করা না থাকলে করে নিতে হবে।
| ব্যক্তিগত টিন করা না থাকলে, প্রয়োজন হবে: – জাতীয় পরিচয় পত্র অথবা পাসপোর্ট এবং ভিসা – নিজের নামে নিবন্ধিত সচল ফোন নং – প্রধান আয়ের উৎস ও সেই অঞ্চল – স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা – টিন নিবন্ধনের কারন |
ব্যক্তিগত টিন করা থাকলে
– টিনের কপি – নিজের নামে নিবন্ধিত ফোন নং বা আইডি ও পাসওয়ার্ড
|
আয়ের উৎস ভিত্তিক কাগজপত্র
আপনার আয়ের উৎস অনুসারে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিচের কাগজপত্র, ডকুমেন্টস, বা রেকর্ডগুলো প্রয়োজন হবে। যার ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য হবে শুধু সেটাই লাগবে। আপনি আপনার বেধগম্যতা মতে কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন ও আমাদের প্রদান করুন, তারপরও কিছু প্রয়োজন হলে আমরা আপনার কাছ থেকে চেয়ে নিব।
- ১. চাকুরী / বেতন খাতে আয়
- কোন ধরনের চাকুরী ও কোন কোম্পানিতে তার বিবরন
- বেতন-ভাতার সার্টিফিকেট
- বেতন ভাতা ছাড়াও যেসব সুযোগ সুবিধা পান তার বিবরণ ও আনুমানিক মূল্য
- কোনো ফান্ডে যদি কোন টাকা কাটে তার বিবরণ ও হিসাব
- উৎসে কর কাটলে সেই হিসাব

- ২. গৃহসম্পত্তি/ গৃহসম্পত্তি খাতে আয়
- গৃহসম্পত্তির বিবরন (ঠিকানা, পরিমাপ)
- নতুন গৃহসম্পত্তি হলে তার ব্যয় হিসাব/ ক্রয় মূল্য
- গৃহের তলা ভিত্তিক ফ্লোর স্পেস ও ভাড়া (ভাড়ার চুক্তিপত্র)
- পৌর করের পরিমাণ (পৌর কর প্রদানের রশিদ)
- বন্ধকি ঋণের ওপর সুদ (ব্যাংকের ইস্যুকৃত বিবরণী বা সার্টিফিকেট)
- বাসস্থান খালি থাকলে তার সময় (উপ-কর কমিশনারকে জানানো হলে পত্রের কপি)
- ৩. কৃষি আয়
- কৃষি জমির পরিমাণ
- ফলন কৃত শস্যের পরিমাণ
- বাজার মূল্য
- কেবলমাত্র কৃষি হতে আয় হলে সেটা উল্লেখ করতে হবে।
- ৪. ব্যবসা বা পেশা খাতে আয়:
- স্থিতিপত্র ও আয়-ব্যয়ের বিবরণী
- ব্যবসার ধরন
- কোন অগ্রিম ট্যাক্স, উৎসে কর কর্তন থাকলে তার হিসাব
- বড় বিনিয়োগ, যন্ত্রাংশ ক্রয়, মেশিন ক্রয়, বা বিশেষ ইনভেস্টমেন্টের জন্য আলাদা বিস্তারিত হিসাব প্রদান করতে হবে
- অংশিদারি ব্যবসা থাকলে উক্ত ব্যবসার আয় ব্যয়ের বিবরন ও উক্ত ব্যবসা হতে ব্যক্তির আয়
- কোন কোম্পানিতে শেয়ার থাকলে তার বিবরন
- ৫. মূলধনি লাভ
- মূলধনি সম্পদের বিক্রয়মূল্য (বিক্রীত চুক্তিপত্র ও বিক্রয়ের রসিদ বা দলিল)
- বিক্রীত সম্পদের ক্রয়মূল্য (ক্রয়ের দলিল অথবা প্রমাণপত্র)
- আনুষাঙ্গিক মূলধনি ব্যয় (ক্রয় ও আনুষঙ্গিক মূলধনি ব্যয়ের প্রমাণপত্র)
- ৬. আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়
- লভ্যাংশ
- ব্যাংকের সুদ বা মুনাফা
- সঞ্চয়পত্রের সুদ
- এফডিআর বা মেয়াদি স্থায়ী আমানত
- ৭. অন্যান্য উৎস খাতে আয় :
- অন্যান্য উৎসের আয়ের সপক্ষে প্রমাণপত্র
- কর রেয়াতের জন্য বিনিয়োগ
- জীবনবীমার প্রদত্ত কিস্তি (প্রিমিয়ার রশিদ)
- ভবিষ্যতে প্রাপ্য বার্ষিক ভাতা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে চাঁদা (উপযুক্ত কর্মকর্তার ইস্যু করা সনদ)
- ভবিষ্য তহবিল আইন, ১৯২৫ অনুযায়ী প্রযোজ্য ভবিষ্য তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা (সনদের ফটোকপি)
- স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে স্বীয় ও নিয়োগকর্তার প্রদত্ত চাঁদা (সনদের ফটোকপি)
- অনুমোদিত বয়সজনিত তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা (নিয়োগকর্তার সনদ)
- অনুমোদিত ঋণপত্র বা ডিবেঞ্চার স্টক, স্টক বা শেয়ারে বিনিয়োগ (বিনিয়োগের প্রমাণপত্র)
- ডিপোজিট পেনশন স্কিমে প্রদত্ত চাঁদা (ব্যাংকের সনদ সর্বোচ্চ, ১,২০,০০০ টাকা বিনিয়োগ অনুমোদনযোগ্য)
- কল্যাণ তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা এবং গোষ্ঠী বীমা কর্মসূচির অধীন প্রদত্ত কিস্তি (নিয়োগকর্তার সনদ)
- যাকাত তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা (প্রমাণপত্র)
- অন্যান্য, যদি থাকে (বিবরণ দিন ও প্রমাণপত্র)
- ৮. ফার্ম, কোম্পানি বা হিন্দু যৌথ পরিবার থেকে আয় :
- অন্যান্য উৎসের আয়ের সপক্ষে প্রমাণপত্র
- কর রেয়াতের জন্য বিনিয়োগ
- ৯. স্বামী- স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে আয় (যদি তাদের ১৮ বছর না হয় বা তাদের নিজেদের টিন না থাকে)
- তবে তাদের আয়ের হিসাব উপরের ক্যাটাগরি অনুসারে প্রদান করতে হবে।
- ১০. বিদেশ থেকে আয় / রেমিটেন্স
- দেশে নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে রেমিটেন্স সার্টিফিকেট
- পাসপোর্ট ও ভিসার কপি / জব ভিসা
- নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা
নোট: উপরের বিভিন্ন যায়গায় যেমন: ব্যাংক হিসাব, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সঞ্চয়পত্র (যেখানে থেকে সুদ বা লাভ আসে) ইত্যাদি থেকে এবং বিভিন্ন ব্যাবসায়ীক লাইসেন্স (যেমন, ট্রেড লাইসেন্স), লেনদেনে, কোন কোম্পানির সাথে লেনদেনে অনেক যায়গায় এডভান্স ট্যাক্স ও উৎসে কর কর্তন করা হয়; সেসব প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠান/ ব্যক্তির কাছ থেকে উৎসে কর্তন করা করের সাপেক্ষে তারা আপনাকে ট্যাক্স সার্টিফিকেট প্রদান করবে, সেটা সংগ্রহ করতে হবে ও কর (দায়) কমাতে কাজে লাগাতে হবে।
আয়ের উৎস ছাড়াও যেসব বিষয় আপনাকে দেখাতে হবে
- বাৎসরিক ব্যয়ের পরিমান দেখাতে হবে (কোন খাতে কত ব্যয় করলেন)
- যেমন; থাকা – খাওয়া, বিল, ভরনপোষন খরচ, শিক্ষা, বিনোদন ইত্যাদি খরচ।
- কোন ঋন গ্রহন করলে বা কাউকে ঋন প্রদান করলে তা উল্লেখ করতে হবে, ঋন দাতা বা গ্রহীতার TIN প্রদান করতে হবে।
- আপনার কাছে থাকা মূলবান সম্পদ (স্বার্ন, গয়না, অলংকার, ঘড়ি, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক্স) দেখাতে হবে
- সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দেখাতে হবে
- জমি জমা থাকলে তার বিস্তারিত এখাবে দিতে হবে – দলিল অনুসারে
| ক্র. | জমির পূর্ন ঠিকানা মৌজা নং, হোল্ডিং নং সহ |
জমির পরিমান শতক আকারে |
পাওয়ার উপায় ক্রয়/দান/ উত্তরাধিকার |
ক্রয় মূল্য/বর্তমান মূল্য নতুন হলে দলিল মূল্য – আগেই পেলে বর্তমান বাজার মুল্য |
- ইত্যাদি
তবে, এই বিষয়গুলো নিয়ে শঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই, আমরা আপনার হয়ে এইসব বিষয়গুলো গুছিয়ে দিব।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করা জন্য ধন্যবাদ।
ধন্যবাদান্ত,
মো: রায়হানুল ইসলাম
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
ফোন নং: +880 1711 386146
e-mail: adv.rayhanulislam@gmail.com
চেম্বার প্রধান, রিজল্ভ লিগ্যাল
প্রধান সম্পাদক, ল হেল্প বিডি
মেম্বার: ঢাকা বার এসোসিয়েশন, ঢাকা ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশন।