আরজি, জবাব ও অন্যান্য – দে. কা. ০৮

কোন ব্যক্তির অধিকার হরণ করলে বা অন্য কোন কারণে সংক্ষুব্ধ হতে তিনি দেওয়ানী আদালতের নিকট লিখিত ভাবে তার অভিযোগটি দাখিল করেন এবং সে বিষয়ে যথাযথ প্রতিকার চান। তখন আদালত অপর পক্ষ বা পক্ষগণকে সমনের মাধ্যমে আদালতের সামনে হাজির হয়ে জাবাব দিতে বলেন। পক্ষগণ তখন লিখিত ভাবে সেই অভিযোগের জাবাব প্রদান করেন এবং সেই জবাবের প্রেক্ষিতে আদালত ঠিক করেন যে মামলাটি আদো চলবে কি চলবে না; এবং চললে কোন বিষয়ে পক্ষগনকে প্রমাণ করতে হবে ইত্যাদি।

মামলার এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।  চলুন বিষয়গুলো সহজে ও সংক্ষেপে একটু বুঝে নেওয়া যাক।


এই যে লিখিত ভাবে অভিযোগ জানানো একে বলা হয় আরজি বা আর্জি [Plaint], লিখিত ভাবে বিবাদী যে উত্তর প্রদান করেন এর নাম লিখিত জবাব [Written Statement], এবং এ দুটোকেই আবার একটা কমন নামে ডাকা হয় আর সেটি হোল প্লিডিংস [Pleadings]


 

আরজি, জবাব ও অন্যান্য

আরজি, জবাব ও অন্যান্য বিষয় বুঝুন একসাথে

দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৬ প্রিডিংস ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আদেশ ৬ । প্লিডিংস [Pleadings]

বিধি, ১ । বাদীর আরজি ও বিবাদীর জবাব দুটোই প্লিডিংস [দুটোর পক্ষেই দুই দিক থেকে দুই দল প্লিড করে বা নিজের দিকের বিষয়টি আদালতকে বোঝাতে চেষ্টা করে]

বিধি, ২। ম্যাটেরিয়াল ফ্যাক্ট থাকবে সাক্ষ্য নয়।

বিধি, ৭। কোন প্লিডিং এমেন্ডমেন্ট না করে নতুন করে কোন দাবি ওঠাতে পারবে না।

বিধি, ১৪। প্রত্যেক  প্লিডিংস [আরজি এবং জবাবে] পক্ষ বা তার প্রতিনিধি এবং উকিলদের দ্বারা স্বাক্ষরিত হবে।

সত্যপাঠ (Verification)

বিধি, ১৫।  প্লিডিংসের নিচে তার পক্ষে (বাদী / বিবাদী ; একাধিক জনের এক জন হলেও হবে) সত্যপাঠ (Verification) এবং স্বাক্ষর করবে। যদি এমন হয় বাদী বা বিবাদী কোন করনে দিতে পারছে না তবে অন্য কেউ যে মামলার বিষয় সম্পর্কে জানে সেও সত্য পাঠ এবং স্বাক্ষর করতে পারে।

কর্তন [Striking Out] 

বিধি, ১৬। কর্তন [Striking Out] 

আদালত; –

  • অনাবশ্যকীয় বা অপ্রয়োজনীয় (Unnecessary Matter) বিষয় 
  • কুৎসাজনক বিষয় (Scandalous)

যা অযথা সুষ্ট বিচারকে বিঘ্ন ঘটায় বা ঘতিগ্রস্থ করে তা কর্তন করবেন / বাদ দেবেন। আদালতে রায় দেওয়ার পূর্বে যে কোন সময় এই কর্তন আদেশ দিতে পারে।

# ‌ এখানে আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা অর্ডার হবে। 

প্লিডিংসএর পরিবর্তন

বিধি, ১৭। প্লিডিংসএর পরিবর্তন;

মামলা যে কোন সময়ে এমনকি আপিলের সময়েও আদালত প্লিডিংস পরিবর্তন / সংশোধন করতে দিতে পারে। [আপিল মামলার একটি চলমান প্রক্রিয়া] 

প্লিডিংসএর পরিবর্তন করতে দেবে যখন;  প্লিডিংসএর পরিবর্তন করতে দেবে না যখন; 
  • আদালতে প্লিডিংসএর পরিবর্তনের জন্য দরখাস্ত দাখিল করা হয়। 
  • ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনে।
  • মামলার ধরন বদলে যাবে 

সংশোধনের সময়

ধারা, ১৮। সংশোধনের সময়

  • আদেশের মধ্যে সময় উল্লেখ থাকলে সেই সময়ের মধ্যে প্লিডিংস সংশোধন করতে হবে।
  • সময় উল্লেখ না থাকলে আদেশ প্রাপ্তির ১৪ দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হবে।

দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭ আরজি ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আদেশ ৭ । আর্জি [Plaint]

আরজির বিষয়

বিধি, ১ ; যেসব বিষয় আর্জিতে থাকতে হবে।

  • আদালতের নাম
  • বাদী ও বিবাদীর নাম, পরিচয়, বসবাসের স্থান
  • ঘটনা এবং মামলার কারন ও সৃষ্টির সময়
  • বাদী বা বিবাদীর মানুষিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত (প্রয়োজনে)
  • আদালতের এখতিয়ার
  • বাদীর প্রতিকার প্রার্থনা
  • কোর্ট ফি নির্ধারন
  • অর্থ মামলার ক্ষেত্রে; দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ
  • স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে; সম্পত্তি সনাক্ত করার যথাযথ বর্ণনা।
  • সেট অফ বিষয় থাকলে তা উল্লেখ করতে হবে।
  • সত্যপাঠ (Verification)
  • অন্যান্য দলিল জমা দিতে হবে

# বাদীর কাছে কোন দলিল না থাকলে তা জানাতে হবে এবং কার কাছে কিভাবে আছে তার একটি বিবরন (লিষ্ট আকারে) দিতে হবে।
# এই ডকুমেন্টের বাইরে ট্রায়েলে ব্যবহার করা যাবে না তবে আদালত নিলে সেটা ব্যতিক্রম।

আর্জি ফেরত। [Return of plant]

বিধি, ১০; আর্জি ফেরত। [Return of plant] (কোন ভুলের কারনে)

কেন?

  • যদি ভুল যায়গায় মামলা করা হয়
  • আর্থিক বা এলাকার এখতিয়ার যদি না হয়
  • তামাদি হলে

কখন?

  • রায় প্রদানের আগে যে কোন সময়

আদালত কিভাবে সিদ্ধান্ত দেবেন?

  • যেদিন আদালতের নিকট মামলা করা হয়েছে এবং যেদিন ফেরত দেওয়া হয়েছে দুটি দিনের তারিখ লিখবেন।
  • ফেরত দেওয়ার কারন লিখবেন

# আর্জি ফেরত আসলে যথাযথ আদালতে গিয়ে আবার মামলার করা যাবে।
# আর্জি ফেরত আসলে তার প্রতিকার: যথাযথ আদালতে আপিল করা যাবে [লিমিটেশন মেনে]

আর্জি ফেরত একটি আপিলেবল অর্ডার [ধারা ১০৪ । আদেশ ৪৩ এর বিধি ১

আরজি নাকচ [Rejection of Plaint]

বিধি, ১১। আরজি নাকচ/ প্রত্যাখ্যান বা খারিজ/ বাতিল [Rejection of Plaint]  (অসতর্কতা এবং অব্যবস্থাপনার কারনে)

চারটি করন;

  • ১. আরজিতে মামলার কারন উল্লেখ না করলে,
  • ২. মামলার মূল্যমান কম ধরলে,
  • ৩. যথাযথ ষ্টাম্প না দেওয়া থাকলে,
  • ৪. আইনি অন্য কোন কারনে (when barred by law)

+ দুটি কেস ল;

    • ক. প্রসেস ফি না দেওয়া হলে [১৯২৪ সালে কলকাতা হাইকোটের রায়ে প্রাপ্ত]
    • খ. আদালত যদি অন্য কোন কারনে / ন্যায় বিচারের স্বার্থে বাতিল করতে চায় [ধারা, ১৫১]

আরজি নাকচ হলে তার প্রতিকার:

১. এটা ডিক্রি তাই আপিল করা যাবে [ধারা ৯৬(১)]
২. নতুন / ফ্রেস মামলা [কিন্তু তা অবস্যই লিমিটেশন মেনে করতে হবে]

মামলা খারিজ ও আরজি খারিজ এক বিষয় নয়। আদেশ ৭ বিধান ১১ এর মতে আজি প্রত্যাখান কর যেতে পারে। আরজি প্রত্যাখ্যানের অর্থ হচ্ছে যে আদো কোন মামলা দায়ের করা হয় নি। পক্ষান্তরে মামলা খারিজের অর্থ হচ্ছে মামলা স্বীকার করে তা বিলুপ্ত করা। তামাদির কারনে আর্জি খারিজ হলে আর নতুন মামলা করা যায় না।

বিধি, ১২। আর্জি ফেরতের আদেশ দিলে আদালত তার কারন লিখে দেবেন।

বিধি, ১৩। তামাদি ছাড়া অন্য কোন কারনে আর্জি ফেরত আসলে নতুন মামলা দায়ের করা যায়।

বিধি, ১৪। আর্জি দাখিলের সাথে দলিল দাখিল করতে হবে।

  • যে সকল দলিলের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে তা দাখিল করতে হবে এবং একটি (সেট) নকল আদালতে পেশ করতে হবে।
  • প্রমানের জন্য অন্য কোন দলিলের উপর নির্ভর করলে এবং তা তার কাছে না থাকলে তিনি একটি তালিকা প্রস্তুত করে তা কার কাছে আছে উল্লেখ-পূর্বক আর্জির সাথে দাখিল করবেন।

বিধি, ১৫। যখন এমন (১৪ নং অনুসারে) কোন দলিল বাদীর হাতে থাকে না তখন তা কর কাছে আছে সেই বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করবে।


দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৮ এ লিখিত জবাব ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আদেশ ৮। লিখিত জবাব এবং সেট অফ [Written Statement and set off]

জবাবের সময়

বিধি, ১ ; জবাবের সময়।

  • সমন প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত জাবাব দিতে হবে
  • ঐ সময়ের মধ্যে জবাব না দিতে পারলে আরে (+) ৩০ দিন সময় পাবে
  • বিবাদী যদি ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে মামলাটি একতরফা নিষ্পত্তি হবে। 
      • তারপরও জবাব দিতে ব্যর্থ হলে এক পাক্ষিক নিষ্পত্তি  [ডিক্রি] হয়ে যাবে (Ex-party Decree) 
        • [প্রতিকার] একতরফা নিষ্পত্তি হলে আপিল করা যাবে

সরকারের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে

প্রসঙ্গত দেওয়ান কার্যবিধির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায় তবে তখন কিছু নিয়ম মেনে আগাতে হবে।

          • ধারা, ৭৯ । সরকার দ্বাারা বা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।
          • ধারা, ৮০ । সরকারকে আগে নোটিশ দিতে হবে।

সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলে ২ মাসের পূর্ব নোটিশ দিতে হবে তবে নোটিশ না দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলে সরকার ৩ মাস সময় পাবে। [ধারা ৭৯ ও ৮০]

# লিমিটেশন এক্ট এর ১৫ ধারা মতে, মামলার কার্যক্রম যতদিন বন্ধ থাকবে (Adjourn) থাকবে সেই দিনগুলো বাদ যাবে।

নতুন ঘটনা, দাবি স্বীকার ইত্যাদি।

বিধি, ২ ; নতুন ঘটনা, দাবি স্বীকার ইত্যাদি।

  • লিখিত জবাবে নতুন কোন বিষয়/ ঘটনা আনলে অবশ্যই তা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করবেন।
  • বাদীর কোন দাবি অস্বীকার করলে তা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হবে।
  • লিখিত জাবাবে চাতুরীপূর্ন কোন উত্তর দেওয়া যাবে না।
  • কোন কিছু উত্তর না দিলে ধরে নেওয়া হবে যে সেই বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।
    • যে সব বিষয় স্বীকার  করে নিয়েছে সে সব বিষয় প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়া হবে এবং সে সব বিষয় নিয়ে আর কোন কথা হবে না। [Admitted Facts need not to be proved, Evidence Act, Section 58]

বিধি, ৩। অস্বীকার  করলে তা সুস্পষ্ট হতে হবে [Denial to be specific]।

বিধি, ৪। ঘুড়িয়ে পেঁচিয়ে (প্রতারণা মূলক ভাবে)  অস্বীকার করা যাবে না।

বিধি, ৫। সুস্পষ্ট ভাবে অস্বীকার না করলে সেই বিষয়টি স্বীকার করছে বলে ধরে নেওয়া হবে।

পারস্পরিক দায় শোধ এবং কাউন্টার ক্লেইম

পারষ্পরিক দায় শোধ বা Set off

বিধি, ৬ ; পারষ্পরিক দায় শোধ বা Set off এবং কাউন্টার ক্লেইম [Counterclaim]

    • সুধু মাত্র অর্থ আদায়ের মামলার ক্ষেত্রে প্রজেয্য হবে এবং লিখিত জবাবের মাধ্যমে দাবিটি জানাতে হবে।
    • বিবাদীর পাওয়া বাদির দাবিকৃত অর্থের কম বা সমান হতে হবে তা না হলে সেটা সেট অফ হবে না বরং কাউন্টার ক্লেইম হবে [Counter Claim]

কাউন্টার ক্লেইম [Counter Claim]

  • কাউন্টার ক্লেইম [Counter Claim] হবার শর্ত;
      • ঐ ট্রায়েল কোর্ট এর এখতিয়ারের মধ্যে থাকতে হবে
      • নতুন করে মামলাটি চালু হবে – Fresh Suit
      • যেহেতু নতুন মামলা হিসেবে চলে আসবে এখানে পক্ষ পরিবর্তন হবে এবং ঐ পক্ষের নতুন করে কোর্ট ফি দিতে হবে।

Related; advalurem court fee [কোর্ট ফি]
২.৫% – ৫০০০০ টাকা পর্যন্ত
২%    – ৪০০০০ টাকা পর্যন্ত

বিধি, ১০। সময় মত Written statement না জমা দিতে পারলে আদালত রায় বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার আদেশ দিয়ে দিতে পারে।

আশাকরি এই বিষয়গুলো এই লেখার মাধ্যমে আপনাদের কাছে একটু হলেও সহজ হয়েছে তবে যদি আপনি বুঝতে না পারেন তাহলে আমাদের দেওয়ানী কার্যবিধি বিষয়ক লেখাগুলো প্রথম থেকে দেখার অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ।

আরো দেখুণ:

বন্ধুদের জানান

ল হেল্প বিডি আইনের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সাধারণ ভাবে আইন নিয়ে আলোচনা করে। আইনের আশ্রয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীর পর্যাপ্ত গবেষণা ও কৌশল প্রয়োগ করেন যার ফলে তা সাধারণ আইনের ব্যতিক্রম হতে পারে, আমাদের সাধারণ লেখা এবং সাধারণ সাহায্য কোন আইনজীবীর বিকল্প নয়। প্রয়োজনে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন অথবা আমাদের প্রফেশনাল সাহায্য নিতে চাইলে নিচের (বাঁয়ে) গোল নীল বাটনে ক্লিক করে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন বা ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: LawHelpBD@gmail.com

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: rayhan@lawhelpbd.com more at lawhelpbd.com/rayhanul-islam

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: দু:খিত এই লেখাটির মেধাসত্ত্ব সংরক্ষিত !!