ব্যবসা শুরু করতে কি কি লাইসেন্স নিতে হবে
আপনি কি একজন নতুন উদ্যোক্তা? আপনি কি ভাবছেন যে ব্যবসা শুরু করবেন কিন্তু আপনার কখন কোন লাইসেন্সটি প্রয়োজন, তা নিয়ে কনফিউজড! তাহলে আপনি সঠিক জায়গায় এসেছেন; আমরা আজকে আলোচনা করব; ব্যবসা শুরু করতে কি কি লাইসেন্স নিতে হবে।
একটি ব্যবসা হলো একটা বাচ্চার মতো। যার প্রথমে জন্ম হয়, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয় সে কোন পথে কাজ করবে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার নাকি সাইেন্টিস্ট হবে? সে জন্য তাকে তেমন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ঠিক একটা ব্যবসার ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই।

প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে যে, ব্যবসাটার জন্ম কোন ফরম্যাটে হবে; এটি কি প্রোপাইটরশিপ হবে, পার্টনারশিপ হবে, নাকি একটি কোম্পানি হবে?
এই বিষয়গুলো নির্ধারণের জন্য প্রথমেই চিন্তা করতে হবে যে; কয়জনে মিলে, কোথায় ব্যবসা করবেন, ব্যবসার ধরণ কী হবে, শোরুম, দোকান বা ফ্যাক্টরি কয়টি থাকবে, কত টাকা ইনভেস্ট করবেন, বছরে কত টাকা রেভিনিউ জেনারেট হতে পারে এবং বছরে কী পরিমাণ প্রফিট আসতে পারে বা আপনার এমপ্লয়ি বা কর্মী কতজন থাকবে ইত্যাদি।
প্রেপাইটরশিপ
যদি এমন হয় যে, আপনি ক্ষুদ্র একটি ব্যবসা শুরু করবেন কিংবা কম পুঁজিতে একটিমাত্র স্থানে বা একটিমাত্র জেলায় তা পরিচালনা করবেন, জেনারেল ট্রেডিং করবেন এবং খুব বেশি ইনভেস্ট করবেন না; সে ক্ষেত্রে আপনি কেবলমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই আপনার প্রোপাইটরশিপ ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে এই ট্রেড লাইসেন্সটি হবে আপনার ব্যবসার মূল ভিত্তি। এই ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে আপনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ওপেন করতে পারবেন এবং আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন। তবে একটি প্রোপাইটরশিপে ওই বিজনেসের সকল অ্যাসেট, লাই্যাবিলিটি, ভালো-মন্দ সবকিছু কিন্তু ওই প্রোপাইটর বা মালিকের ওপরই বর্তায়, যা ব্যবসা বড় হয়ে গেলে একটু বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে।
পার্টনারশিপ ফার্ম
আর আপনার ব্যবসাটা যদি এমন হয় যে, ব্যবসাটি ছোট, খুব বেশি ইনভেস্টমেন্ট নেই, তবে একাধিক ব্যক্তি এখানে ইনভেস্ট করবেন (কেউ অর্থ ইনভেস্ট করবেন, কেউ স্কিল ইনভেস্ট করবেন, আবার কেউ রেফারেন্স ইনভেস্ট করবেন); তাহলে আপনাদের করতে হবে একটি পার্টনারশিপ ফার্ম। পার্টনারশিপ ফার্ম করার জন্য আপনাকে একটি পার্টনারশিপ ডিড সুন্দর করে আইন মোতাবেক তৈরি করতে হবে। এই পার্টনারশিপ ডিডটি খুব ভালোভাবে লিখতে হবে, যাতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে পার্টনারদের কার কী দায়িত্ব রয়েছে, কে কত টাকা ইনভেস্ট করবেন এবং কে কত পার্সেন্ট প্রফিট নেবেন ইত্যাদি।

মো: রায়হানুল ইসলাম, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
মনে রাখবেন, একটা পার্টনারশিপ ফার্মে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ২০ জন পর্যন্ত পার্টনার থাকতে পারে এবং এই পার্টনারশিপটি রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিস অ্যান্ড ফার্মস (RJSC)-এ নিবন্ধন করতে হয়। একটি পার্টনারশিপে সকল বিষয় ওই ফার্মের নামেই হয়। পার্টনারশিপে ‘জয়েন্ট লাই্যাবিলিটি’ বলে একটা বিষয় থাকে; অর্থাৎ এই ফার্মের কোনো লাই্যাবিলিটি সবার ওপরই বর্তায় এবং প্রফিটও সবাই পায়। পার্টনারশিপ পরিচালনা করতে হলে আরজেএসসি-তে নিবন্ধন করতে হয়, পার্টনারশিপের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় এবং আলাদা টিন (TIN) ও বিন (BIN) নিতে হয়।
পার্টনারশিপ ফার্মের বেশ কিছু সুবিধার মধ্যে রয়েছে; এতে অডিট করাতে হয় না এবং প্রতি বছর রিটার্ন জমা দিতে হয় না। তাই যারা তুলনামূলকভাবে কম ইনভেস্টমেন্টে ব্যবসা শুরু করে তা কেমন চলে দেখতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সেরা অপশন হলো পার্টনারশিপ ফার্ম। তবে পার্টনারশিপের মূল সমস্যা হলো, একজনের দোষে সবাই দায়বদ্ধ হয়ে থাকেন, ব্যবসায় ক্ষতি বা লস হলে তা পার্টনারদের ওপর ব্যক্তিগত দায় হিসাবে বর্তায়। কোনো নতুন পার্টনার নিলে আগের পার্টনারশিপটি ভেঙে যায়, পার্টনারদের উত্তরাধিকারীরা অটোমেটিক পার্টনার হয় না ইত্যাদি।
কোম্পানি
এখন যদি এমন হয় যে, আপনি আপনার ব্যবসাটি একটু বড় পরিসরে শুরু করতে চাচ্ছেন, সারা বাংলাদেশে বা ইন্টারন্যাশনালি কাজ করবেন, যেখানে ভালো ইনভেস্টমেন্ট ও প্রফিটের আশা রয়েছে, অনেক পার্টনার বা শেয়ারহোল্ডার থাকবে এবং আপনি ব্যাংক থেকে লোন নিতে চান; তখন আপনাকে কোম্পানি নিবন্ধন করতে হবে। আপনি যদি ২ থেকে ৫০ জনের মধ্যে শেয়ারহোল্ডার রাখতে চান, তাহলে আপনাকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধন করতে হবে। আর যদি আনলিমিটেড শেয়ারহোল্ডার রাখার সুযোগ চান, সে ক্ষেত্রে আপনার জন্য রয়েছে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধনের সুযোগ।
কোম্পানির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো; কোম্পানি বেশ অর্গানাইজড থাকে, যার ফলে বড় বড় কন্ট্রাক্ট বা কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় , সহজে ইনভেস্টর পাওয়া যায় ও নেওয়া যায়, সহজে লোন পাওয়া যায়। কোম্পানিতে প্রতি বছর অডিট করাতে হয়, ফলে আয়-ব্যয় ও লেনদেন খুব স্বচ্ছ থাকে। চাইলেই কেউ হুট করে কাউকে কোম্পানি থেকে বের করে দিতে পারে না। একটি কোম্পানি যুগের পর যুগ ধরে চলতে পারে, এটি নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যায় না। একটি কোম্পানি তার শেয়ারহোল্ডারদের ছাড়াও সুন্দরভাবে চলতে পারে। কোম্পানিতে চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ডিরেক্টররা মিলে ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’ গঠন করেন, যারা কোম্পানি পরিচালনা করেন; তাছাড়াও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানির বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কোম্পানির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো; এটি একটি সেপারেট লিগ্যাল এন্টিটি (স্বতন্ত্র আইনি সত্তা); অর্থাৎ কোম্পানির কোনো লাই্যাবিলিটি শেয়ারহোল্ডারদের ব্যক্তিগত ঘাড়ে এসে পড়ে না, ব্যবসায় ক্ষতি বা লস হলে তা শেয়ারহোল্ডারদের ওপর ব্যক্তিগত দায় হিসাবে বর্তায় না।
এই তিনটি ফরম্যাটের যেকোনো একটি ফরম্যাটে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন করতে হবে। এটাকে আমরা বলছি একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ‘জন্ম’। এখন জন্মের পর যেমন নির্ধারণ করতে হয় যে শিশুটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে কী করবে বা কোথায় পড়বে; ঠিক তেমনি ব্যবসার ক্ষেত্রেও তাই। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স নিতে হতে পারে।
ট্রেড লাইসেন্স
সবার আগে আসি ট্রেড লাইসেন্সের কথায়। শুধুমাত্র ট্রেডিংয়ের জন্যই হোক কিংবা ওপরে উল্লেখিত যেকোনো ফরম্যাটেই নিবন্ধন করুন না কেন, আপনার কিন্তু একটি ট্রেড লাইসেন্স অবশ্যই লাগবে। ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার নিয়ম হলো; আপনি যেই এলাকায় বাণিজ্য পরিচালনা করবেন, সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ) থেকে এটি সংগ্রহ করতে হবে।
টিন (TIN) ও বিন সার্টিফিকেট (BIN)
ট্রেড লাইসেন্সের পরেই অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি টিন (TIN) ও একটি বিন সার্টিফিকেট (BIN)। শুধুমাত্র সাধারণ ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসা করলে সবসময় টিন-বিন বাধ্যতামূলক না-ও হতে পারে, তবে আপনি পার্টনারশিপ বা কোম্পানি নিবন্ধন করলে পার্টনারশিপ ফার্ম বা কোম্পানির নামে আলাদা টিন ও বিন অবশ্যই খুলে নিতে হবে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
এরপর অতি জরুরি বিষয় হলো আপনার ব্যবসার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা। ইতিমধ্যে আপনার যে কাগজগুলো রেডি হয়েছে, সেগুলো নিয়ে ব্যাংকে গেলেই তারা আপনার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দেবে।
আমদানি-রপ্তানির (Import-Export)
আপনি যদি আমদানি-রপ্তানির (Import-Export) কাজ করতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনাকে ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট লাইসেন্স করতে হবে। এর জন্য স্থানীয় ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ এবং ব্যাংক থেকে সলভেন্সি সার্টিফিকেট নিতে হবে। এরপর এলসি (LC) খুলে এবং সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
ট্রেডমার্ক
আপনি যদি নিজের নামে ব্র্যান্ডিং করতে চান এবং চান যে আপনার ব্র্যান্ড অন্য কেউ ব্যবহার না করুক, তবে অবশ্যই একটি ট্রেডমার্ক নিবন্ধন করে নেওয়া উচিত। ৪৫টি ক্যাটাগরি থেকে আপনার ক্যাটাগরি অনুসারে অনলাইনে আবেদন করে ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। নিবন্ধন পেতে আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, তবে আবেদন করার পর থেকেই আপনি তা ব্যবহার করতে পারবেন।
বিএসটিআই
আপনি যদি কোনো পণ্য, খাদ্য বা শিশুখাদ্য উৎপাদন করতে চান, তবে অবশ্যই বিএসটিআই-এর অনুমোদন নিতে হবে। বিএসটিআই পণ্যের গুণগত মান এবং মোড়কজাতকরণ—এই দুটি বিষয়ে লাইসেন্স দিয়ে থাকে। মনে রাখবেন, অনেক পণ্য রয়েছে যেগুলো বাধ্যতামূলকভাবে বিএসটিআই-এর লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন ও বাজারে সাপ্লাই করতে হয়; এর বাইরে গেলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। আপনি যদি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবসা করতে চান, তবে সিভিল এভিয়েশনের লাইসেন্স লাগবে। আবার রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করতে চাইলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।
অন্যান্য লাইসেন্স
আপনার যদি নিজস্ব কারখানা বা ফ্যাক্টরি থাকে এবং আপনি বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনে যান, তবে অবশ্যই সেই ফ্যাক্টরির একটি ফ্লোর প্ল্যান করতে হবে। খাদ্যপণ্য হলে প্রেমিসেস লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স এবং পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে এমন কিছু হলে পরিবেশ লাইসেন্স (DOE) বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হবে।
এছাড়া কলকারখানা অধিদপ্তরের অনুমোদনও অত্যন্ত জরুরি; আপনার প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক থাকলে আপনাকে অবশ্যই নিয়ম মেনে তাদের নিয়োগ দিতে হবে এবং সময়মতো কলকারখানা অধিদপ্তর থেকে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।
ভ্যাট (VAT) ও ট্যাক্সের (Tax)
এছাড়াও, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল লাইসেন্স থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রতিটি ধাপে আপনাকে আইন মেনে ভ্যাট (VAT) ও ট্যাক্সের (Tax) সঠিক হিসাব রাখতে হবে এবং ক্রেতা বা সমপরিমাণ লেনদেনের ক্ষেত্রে নিয়মিত চালান বা ইনভয়েস কাটতে হবে। নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী উৎসে কর কর্তন বা টিডিএস (TDS) এবং উৎসে ভ্যাট বা ভিডিএস (VDS) কেটে তা সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আইন অমান্য করে কোনো লেনদেন করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা বা জরিমানের মুখে পড়তে হতে পারে।
পাশাপাশি, যেকোনো পণ্য বা সেবা বাজারে ছাড়ার বা বিপণন করার আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, যথাযথ অনুমোদন ও ট্যাক্স-ভ্যাটের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কোনো পণ্য বাজারজাত করলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি বা জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
মনে রাখতে হবে, আগের মতো চাইলে একটি দোকান দিয়ে একটি ব্যবসা দাঁড় করানো যায় না। ব্যবসা করতে হলে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়, ট্যাক্স ও ভ্যাট সম্পর্কে জানতে হয়, তাই একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করে ব্যবসার প্ল্যান করা উচিত, অন্যথায় আপনার মনে হবে আপনি ব্যবসায় লাভ করছেন কিন্তু বছর শেষে দেখবেন আপনার লস হয়েছে!
এই লেখার মাধ্যমে আমরা ব্যবসা শুরু করার বা পরিচালনা করার জন্য কী কী লাগবে তার একটা ওভারঅল আইডিয়া দিলাম। এখানের প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে আমাদের আলাদা আলাদা ভিডিও ও ব্লগ রয়েছে, সেগুলো আপনারা দেখতে পারেন। প্রয়োজনে এই লাইসেন্সগুলো করতে আপনারা আমাদের সহযোগিতা নিতে পারেন।
আরো কিছু জনাতে চাইলে কমেন্ট করুন, অথবা সরাসরি আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।