নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার ক্ষমতা

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিছু কার্যকলাপ সমাজের কিছু মানুষ খুব পছন্দ করছেন তাদের বিচার করার প্রক্রিয়া অনেকটা ফাটা কেষ্টের মত, ধুপ-ধাপ অন স্পট, অন ডিমান্ড যার কিনা অনেক পাবলিক ডিমান্ড; নি: সন্দেহে একজন নির্বাহী তার যোগ্যতার বলে এমন একটি অবস্থানে আসেন এবং সে তার কাজ করে বাহবা পেতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা সাধারণ জনগন কি আদৌ তাদের কাজ বুঝি? তারা যা করছেন তার সাথে আইনের সম্পর্ক না বুঝেই আমারা তাদের হিরো বানিয়ে দিচ্ছিনা তো? পপুলার ডিমান্ডের কারণে কোন সাধারণ মানুষ হয়রানি হচ্ছে নাতো? অথবা তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করে আমারা আমাদের আরও বড় ক্ষতি করে ফেলছিনা তো?

চলুন একটু বিশ্লেষণ করি, তবে প্রথমেই একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি “বিচারক হওয়া কি এতই সহজ? ” এর উত্তর খোঁজার আগে বিচারের কিছু মূল নীতি দেখে নেই। 

বিচারের মূলনীতি

প্রতিটা বিচার এক একটা গবেষণার ব্যাপার। প্রথমত, Principles of Natural Justice বা বিচারের মূলনীতি জানা যাক। ন্যায় বিচারের প্রধান মূলনীতি ২ টি। 

  • ১) Audi alteram partem – অভিযোগ পক্ষ এবং অভিযুক্ত উভয় পক্ষকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যথেষ্ট কথা বলা এবং আনুষঙ্গিক এভিডেন্স প্রডিউস করার সুযোগ দিতে হবে। এবং
  • ২) Nemo judex causa sua – বিচারককে নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে হবে। মামলার কোন পক্ষের সাথে বিচারকের কোন প্রকার পূর্ব ভাল সম্পর্ক বা খারাপ সম্পর্ক বা আত্মীয়তা বা পূর্ব যোগাযোগ থাকা যাবে না। এমনকি কোন বিচারকের গাড়ির ড্রাইভার বা পেশকার, অফিসের কেউ বা গৃহকর্মী বা স্ত্রী-স্বামী, সন্তান, ভাই, বাবা-মা সহ কোন আত্মীয় কোন মামলায় ভিক্টিম বা আসামী যাই হোক না কেন, সে মামলার বিচার উক্ত বিচারক করতে পারবেন না। 

সালমান শাহ, শাবানা, আলমগির অভিনীত বিখ্যাত বাংলা সিনেমা “সত্যের মৃত্যু নাই” তে দেখা যায় বাবা আলমগীর সন্তান সালমান শাহের বিচারে মৃত্যু দণ্ড দেন। আইন অনুযায়ী এটা হাস্যকর এই সিনেমাটি সাধারণ দর্শকদের জন্য অনেক আবেগী ব্যাপার হলেও উক্ত পরিচালক আইনের ছাত্রদের জন্য কমেডি বানিয়ে ফেলেছেন। এছাড়াও বিচারের আরেকটা মূলনীতি হল বিচারের রায় হতে হবে speaking order. অর্থাৎ, রায়ের আদেশে উক্ত রায়ের পক্ষে যথেষ্ট লিখিত যুক্তি দেখানো থাকতে হবে।

এছাড়াও এটা মনে রাখা খুব জরুরী যে কোন দেশের চালিকা শক্তি তিনটি ভাগে ভাগ করা থাকে, যেগুলো হল;

  • ১. আইন সভা (জাতীয় সংসদ) : যার কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা।
  • ২.  নির্বাহী বিভাগ : যাদের কাজ হচ্ছে সরকারের পলিসি মতে দেশ পরিচালনা করা এবং আদালতের রায় বাস্তবায়ন করা।
  • ৩. বিচার বিভাগ: এদের কাজ হচ্ছে বিচার করা।

এই তিনটি আলাদা ভাগে রাখার কারণ হচ্ছে  কোন একটি ভাগ যেন বাধাহীন শক্তি না পেয়ে যায় এবং তার খেয়াল খুশি মতন সব না করতে পারে।  যাকে বলা হয় সেপারেসন অব পাওয়ার (Separation of Power) এবং এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। এরা প্রত্যেকেই যার যার কাজ স্বাধীন ভাবে করবে কিন্তু আইন বহির্ভূত ভাবে করতে পারবে না এবং একে অপরের সাহায্য নিয়ে সংবিধান অনুযায়ী দেশ গড়া তথা পরিচালনায কাজ করবে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কেমন বিচারক!

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা (এ) কেমন বিচারক!

চলুন এবার দেখি বিচারক কিভাবে হতে হয় এবং তার আলোকে আমরা একজন নির্বাহীর বিচার করার ক্ষমতা বিবেচনা করবো।

 

বাংলাদেশে বিচারকের যোগ্যতা

এবার বাংলাদেশে বিচারকের যোগ্যতা এবং ক্ষমতা কেমন দেখা যাক। বিচারক হতে গেলে; 

প্রথমত, আইনে স্নাতক হতে হয়। এরপর ১০০ নাম্বারের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। এতে বিসিএসের বিষয় গুলো এবং আইন থেকে প্রশ্ন হয়। এর পরের ধাপ হল ১০ দিনে ১০০০ মার্ক্সের লিখিত পরীক্ষা হয়। এখানে বিসিএসের বিষয় গুলো থেকে ৪০০ মার্ক্স এবং আইন থেকে ৬০০ নম্বর থাকে। এরপর ১০০ নাম্বারের ভাইবা হয়। লিখিত এবং ভাইবার প্রাপ্ত নাম্বার যোগ করে সর্ব মোট নাম্বারের ভিত্তিতে সিরিয়াল হয়। এই সিরিয়াল থেকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। কোন ওয়েটিং লিস্ট থাকে না। বিগত বছরগুলোতে দেখা যায়, সার্কুলার থেকে গোটা নিয়োগ পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত রেজাল্ট ছয় মাসের মধ্যে প্রকাশ করা হয়। BJS এর এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের শত ভাগ আস্থা আছে।

 

এবার দেখি, এত সংগ্রাম করে বিচারক হবার পর বিজ্ঞ বিচারকেরা কেমন ক্ষমতা অর্জন করেন:

প্রথমে দেওয়ানী (সিভিল) মামলার ব্যাপারে বলি,

  • নিয়োগের পর প্রথম পদ হল Assistant Judge বা সহকারী জজ যিনি সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা মূল্যমানের সম্পত্তির মামলার বিচার করতে পারেন। 
  • এরপর 4/5 বছর চাকরির পর প্রমোশন পেয়ে যদি Senior Assistant Judge বা সিনিয়র সহকারী জজ হন, তখন তিনি ৪ লাখ টাকা মূল্যমানের সম্পত্তির বিচার করতে পারেন। 
  • এরপর Joint District Judge বা যুগ্ম জেলা জজ হলে হলে তখন যে কোন মূল্যমানের সম্পত্তির মামলা বিচার করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হন।

 

এবার দেখি ফৌজদারী আদালতের  বা Criminal Court এর বিচারকেরা কে কতটা ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন;

  • নিয়োগের প্রথম ধাপ হল তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট। উনি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ২ হাজার টাকা জরিমানার যোগ্য মামলা বিচার করতে পারেন। 
  • এরপর প্রমোশন পেয়ে হন ২য় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট। তখন ৩ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা যায় এমন অপরাধের বিচার করতে পারেন। 
  • এরপর আরও কয়েক বছর চাকরির পর প্রমোশন পেয়ে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হলে তখন সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানার শাস্তি দেয়া যায় এমন মামলার বিচার করতে পারেন। 
  • যুগ্ম দায়রা জজ ১০ বছরের বেশি কারাদণ্ড যোগ্য মামলার বিচার করতে পারেন না। এরপর অতিরিক্ত দায়রা জজ বা দায়রা জজ মৃত্যু দণ্ড যোগ্য অপরাধের বিচার করতে পারেন। (CrPC, section 32, 31)

এভাবে ধীরে ধীরে একজন বিচারক বিজ্ঞ থেকে বিজ্ঞত্বর হয়ে ওঠেন, এবং সে অনুযায়ী ধীরে ধীরে ছোট থেকে বড় মামলার বিচার করেন।

বাংলাদেশের আদালত সমূহের শ্রেণী বিন্যাস দেখুন এখানে (ইংরেজীতে)

 

কি? মাথা ঘুরে যাচ্ছে? জী হ্যাঁ এটাই বাস্তবতা।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

এবার আসি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (Executive Magistrate) তথা Public Administration বা Admin Cadre এর বিষয়ে। ফৌজদারী কার্যবিধির ১০ ধারা অনুযায়ী সরকার প্রতিটি জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ প্রদান করবেন এবং প্রয়োজনে  বিশেষ ক্ষেত্রেও এদেরকে বিশেষ কাজের জন্য নিয়োগ প্রদান করবেন। এদের নাম থেকেই বোঝা যায় এদের প্রদান কাজ হচ্ছে সরকার বা বিচারিক আদালতের নীতিমালা বা নির্দেশ মোতাবে কোন কাজ সম্পাদন করা বা Execute করা। এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মূল কাজ বিচার করা নয় বরং কোন বিশেষ বা জরুরী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা সামাল দেওয়া জন্য বিচার করা বা ক্ষুদ্র কিছু বিষয়ে যা সাধারণ আদালতে দিলে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট হবে সেই সব বিষয়ে দ্রুততার সাথে বিচার করা। [সাধারণ ক্ষমতা]

 

মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক ক্ষমতা:

প্রথমেই বলে রাখি মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে যে ক্ষমতা ওনারা ব্যবহার করতে তা সাধারণ ক্ষমতা না বরং বিশেষ ক্ষমতা এবং এই বিশেষ আইন তথা বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োজনের সাধারন আইনের উপরে ব্যবহার করা হয় কিন্তু তার মানে এই নয় যে এই আইন না থাকলে অপরাধ সূমহের বিচার করা যেত না বা বিচার হয় না। আমাদের সাধারণ প্রক্রিয়ায় বিচার করা যায় এবং বিচার হয়েও আসছে।

ক্ষমতা প্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় আইনের অধীন কোন অপরাধ, যাহা কেবল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য, তাহার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হইয়া থাকিলে তিনি উক্ত অপরাধ তাৎক্ষণিক ভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, দোষী সাব্যস্ত করিয়া, এই আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন।  (মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯, ধারা ৬)

খেয়াল করুন, উক্ত অপরাধ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিজের চোখের সামনে না হলে তিনি তার বিচার করতে পারবেন না। আর জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা কতটুকু তা উপরে আগেই আলোচনা করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এই বিচারের পূর্বশর্ত ২ টি। তা হল-

  • ১) ম্যাজিস্ট্রেটের নিজের সামনে উক্ত ছোটখাটো অপরাধ সংঘটিত বা উদঘাটিত হতে হবে।এবং
  • ২) অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোন প্রকার জোর জবরদস্তি ছাড়া নিজের দোষ স্বীকার করতে হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দোষ স্বীকার না করলে তাকে থানার মাধ্যমে এজাহার দায়ের পূর্বক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বা দায়রা আদালতে প্রেরণের আদেশ দিয়ে সম্মানিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিদায় নেবেন।

এবার দেখুন:

তফসিলে বর্ণিত কোন আইনের অধীন কোন অপরাধ কোন্ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার্য হইবে তাহা উক্ত আইনে নির্ধারণ করা না থাকিলে, ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা ২৯ এর সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় তফসিলের অষ্টম কলাম অনুযায়ী নির্ধারিত আদালত কর্তৃক উক্ত অপরাধ বিচার্য বলিয়া গণ্য হইবে এবং যদি অনুরূপ কোন অপরাধ বিচার করিবার এখতিয়ার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের না থাকে, তাহা হইলে উক্ত অপরাধ, তফসিলে বর্ণিত আইনের অধীন অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনের অধীন আমলে গ্রহণ করিয়া দণ্ড আরোপ করিবার এখতিয়ার এই আইনের অধীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের থাকিবে না।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিবার সময় যদি এইরূপ কোন অপরাধ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর সন্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হয়, যাহা সেশন আদালত কিংবা অন্য কোন উচ্চতর বা বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার্য, তাহা হইলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এজাহার হিসাবে গণ্য করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করিবেন। (একই ধারা ৬, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯)

 

এরপর দেখুন,

এই আইনের অধীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিবার সময় কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে গৃহীত হইবার পরপরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত অভিযোগ লিখিতভাবে গঠন করিয়া উহা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পাঠ ও ব্যাখ্যা করিয়া শুনাইবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি গঠিত অভিযোগ স্বীকার করেন কি না তাহা জানিতে চাহিবেন এবং স্বীকার না করিলে তিনি কেন স্বীকার করেন না উহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানিতে চাহিবেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হইলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগটি বিচারার্থে উপযুক্ত এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে প্রেরণ করিবেন। (ধারা ৭)

 

এবার দেখুন ক্লাইম্যাক্স পর্ব:

এই আইনের অধীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিয়া দণ্ড আরোপ করিবার ক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে যে দণ্ডই নির্ধারিত থাকুক না কেন, ২ বছর এর অধিক কারাদণ্ড এই আইনের অধীন আরোপ করা যাইবে না। (ধারা ৮)

অর্থদণ্ড তাৎক্ষণিক ভাবে আদায় করিতে ব্যর্থতার কারণে আরোপনীয় বিনা শ্রম কারাদণ্ড তিন মাসের অধিক হইবে না। (ধারা ৯)

 সম্প্রতি ঢাকায় তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিশুদের বিচার করেছেন। শিশু আইন, ২০১৩ এর ধারা ১৬(২) অনুযায়ী দায়রা জজ স্পেশাল রুমের স্পেশাল ডেকোরেশন সহ শিশু আদালতের বিচারক হিসেবে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত প্রচলিত বিচার পদ্ধতির বাইরে শিশু আইনে নির্দেশিত অন্য প্রক্রিয়ায় বিচার করবেন।

 

একটু লক্ষ করুন, জেলা ও দায়রা জজের পদমর্যাদার সমান পদমর্যাদায় আছেন;

সরকারের সচিবগণ, জেলা ও দায়রা জজগণ, সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সম-পদমর্যাদার অফিসারগণ, RAB প্রধান, পুলিশের অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। এবং রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের এ তালিকায় জেলা ও দায়রা জজের অবস্থান ১৬তম । অন্যদিকে জেলার সর্বোচ্চ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হলেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (ডিসি) যার অবস্থান ২৪ তম এবং এটা সকেলেরই জানা যে একটি জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গণ  জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (ডিসি) অধীনস্থ হয়ে থাকেন। 

 

নির্বাহী কর্মকর্তার কাজ কি?

  • মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন;
  • জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে অর্পিত নির্বাহী দায়িত্ব পালন;
  • সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি করা। যেমন গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প, বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্প;
  • সিনিয়র সহকারী কমিশনারের অবর্তমানে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব, ভূমি অধিগ্রহণ, জেনারেল সার্টিফিকেট শাখায় দায়িত্ব পালন;
  • সরকারী বিভিন্ন বাস্তবায়িত নীতির ফলাফল যাচাই ও ফিডব্যাক প্রদানে ইউ এন ও এবং জেলা প্রশাসককে সাহায্য করা;
  • ইট ভাটার লাইসেন্স প্রদান, সার্কাস, যাত্রা, মেলা ইত্যাদির জন্য অনুমতি প্রদান
  • মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন, মোটরযানের মালিকানা সনদ, রোড পারমিট সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি
  • আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজ ইত্যাদি।

 

এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে আইনে একজন নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেটকে কি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং নিশ্চিত ভাবেই একজন  নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট এই বিষয় গুলো জেনেই তার দায়-দায়িত্ব নিয়ে থাকেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যায় এই নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেটরা তাদের অবস্থা ও দায়িত্ব ভুলে, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের খেয়াল খুশি মত বিচারক বনে গেছেন। তারা ভুলে গেছেন যে তারা এই দেশের রাজা বাদশা নন বরঞ্চ তারা এই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী মাত্র, যারা আইনসভার বা সংসদের আইন মেনে চলতে বাধ্য, হিরো হওয়া বা ব্যক্তি চিন্তা, চেতনা বা আবেগের বশে তাদের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। 

যেখানে তাদের অবস্থান বিচারক হিসেবে খুব-ই ক্ষুদ্র সেখানে তারা যেন নতুন নতুন আইনের উদ্ভব করে যাচ্ছেন! কেউ বাচ্চা ছেলে মেয়েদের ধরছেন, কেউ চুল কাটছেন, কেউ বে আইনি ভাবে মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন আবার কেউবা নিজেরাই আইন প্রনেতা হয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, তারা অনেক সময়েই নিজের মন মতন আইনের (অপ)ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, যেই ক্ষমতা তাদের দেয়া হয় নি এবং তারা সেটির যোগ্যও নন।

তাহলে কেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এমন লাইম লাইটে থাকেন? 

যেখানে একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাসে ৪০ থেকে ৬০ টা মামলায় রায় দেন, এগুলো ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেন না। কিন্তু এই মহান আবেগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ মাসে ১/২ টা ক্ষমতা বহীর্ভূত বে-আইনি বিচার করে প্রমাণ করতে চান তারা না থাকলে দেশে কোন বিচারই হত না। আর আইন কম জানা মানুষগুলো এগুলো দেখেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পারেন আর ভাবেন এরা না থাকলে দেশে কোন বিচার-ই হত না, বলাই বাহুল্য এর অন্যতম কারণ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এবং মিডিয়া ষ্ট্যান্ট।

বিচার বিভাগ যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কেইস নিয়ে ডিল করে এবং সেগুলো সুষ্ঠ বিচারের স্বার্থে মিডিয়া তথা জনগণের সামনে (সব বিষয়) উন্মুক্ত না করে পরিচালনা করেন সেখানে কতিপয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের  ১/২ টা ভাইরাল বিচার দেখে জনগণ ভাবেন ওনারাই বড় বিচারক! অবশ্য সাধারণ জনগণের দোষ দিয়েও খুব লাভ নেই কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আইন, অধিকার, যুক্তি ও জটিল চিন্তা সম্পর্কে কোন পাঠ নেই তাই সাধারণ ভাবে চোখের সামনে যা আসে তাই তারা ধারণ করে। কিন্তু বিচার বিষয়টি মোটেই এত সহজ নয়। বর্তমানে কিছু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের  কাজ সুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয় বরং ক্ষমতা বহির্ভূত ও বেআইনিও বটে।

ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ করলে আইনের ভাষায় তাকে Ultra Vires বলে। Ultra Vires হলে যেকোন বিচারকের কাজ অবৈধ হয়ে যায়।

আলোচিত কিছু ঘটনায় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বা আইন বা পরিণাম না জেনে আবেগে ও হিরো সাঁজার নেশায় মত্ত এসব ম্যাজিস্ট্রেটকে সম্প্রতি উচ্চ আদালত “অদক্ষ” বলে মন্তব্য করেছেন। অবশ্যই উচ্চ আদালত এই বিষয়ে আমাদের চেয়ে ভাল বোঝেন এবং সঠিক মন্তব্য করেছেন বলেই আমারা ধরে নেই তথাপি সুধু এই ভর্ৎসনাই যথেষ্ট নয়, এদের আইন বহির্ভূত কাজগুলোর পূর্ণ তদন্ত সাপেক্ষ যথাযথ প্রশাসনিক এবং যেখানে দেওয়ানী বা ফৌজদারী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এবং সেই ব্যবস্থার নির্দেশ দানও খুব জরুরি বলে আমরা মনে করি। যাতে করে আইনে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যাতে কেউ ভবিষ্যতে আইনের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করার আগে দশবার ভাবে।

মতিউর রহমান

মতিউর রহমান

মতিউর রহমান। আইন বিভাগ, ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল নং 01761426960 e-mail: motiurmdm@gmail.com

You may also like...

1 Response

  1. Avatar Tariqul Islam shakil says:

    জুডিশিয়ারির হাতে এক্সিকিউটিভ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা প্রদানকরা হোক।

Leave a Reply

error: দু:খিত এই লেখাটির মেধাসত্ত্ব সংরক্ষিত !!