লিগ্যাল এইড কি? ও কিভাবে পাবেন?

আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ১৯৪৮ সালের “সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র” এর ৭ নং অনুচ্ছেদে কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়া আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান অধিকারের ব্যাপারে উল্লেখ রয়েছে। একটি দেশে তখনই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় যখন সে দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান হয়ে সমান সুযোগ এবং অধিকার ভোগ করতে পারে।

আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০: আইনের সমানাধিকরণ প্রতিষ্ঠায় এক অভাবনীয় উদ্যোগ

আমাদের দেশে এমন অনেক দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিত বিচার প্রার্থী রয়েছে যারা অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে একটি মামলা দায়ের করতে পারে না, এমনকি আদালতে আসা যাওয়ার খরচ পর্যন্ত তারা বহন করতে অক্ষম। এভাবে অর্থ ও সুযোগের অভাবে দেশের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আইনি প্রতিকার বা আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। আর অসহায় ও দরিদ্র নাগরিকদের এই অধিকারকে কার্যকর করতে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা বা লিগ্যাল এইড প্রদানের লক্ষ্যে ২০০০ সালে “ আইনগত সহায়তা প্রদান আইন,২০০০” নামে একটি আইন প্রণীত হয়। এই আইনের ধারা ২(ক) অনুযায়ী আইনগত সহায়তা অর্থ – আর্থিক অসচ্ছল অথবা নানাবিধ আর্থ সামাজিক কারণে ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচার প্রার্থীকে আইনী সহায়তা প্রদান করা। এই আইনের আওতার সরকার জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এ সংস্থার অধীনে প্রত্যেক জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান করছে।

বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা

আইনগত সহায়তা প্রদানে বিভিন্ন কমিটি ও এর আবেদন প্রক্রিয়া

আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্য ২০০০ সালের আইনটির অধীন প্রতিষ্ঠিত সুপ্রীম কোর্ট কমিটি, জেলা কমিটি বা বিশেষ কমিটির নিকট আবেদন করতে হয়। এক্ষেত্রে “আইনগত সহায়তা প্রদান বিধিমালা, ২০১৫ এর ধারা ৩ এ আবেদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ধারা ৩ অনুযায়ী আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রত্যেক বিচার প্রার্থী তার নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং আইনগত সহায়তার কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করবে। সেক্ষেত্রে, আপীল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগে বিচারের বিষয় হলে সুপ্রীম কোর্ট কমিটির চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করবে এবং অন্যান্য আদালতে বিচারের বিষয় হলে জেলা কমিটি বা ক্ষেত্রমতে বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করবে। আবেদন প্রাপ্তির পর কমিটি একটি ক্রমিক নম্বর প্রদান করে নির্দিষ্ট রেজিস্টারে আবেদনপত্রের বিবরণ লিপিবদ্ধ করবে এবং বিচার প্রার্থীকে একটি প্রাপ্তি রশিদ প্রদান করবে। উল্লেখ্য, একজন আবেদনকারী বিচার প্রার্থীর দায়িত্ব, মামলা পরিচালনা করার জন্য আইনজীবী মনোনয়ন, আইনজীবীদের ফি, মামলার প্রাসঙ্গিক খরচ সম্পর্কেও উক্ত বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

লিগ্যাল এইড অফিস এবং লিগ্যাল এইড অফিসার

Mahmuda Amir Eva

Author: Mahmuda Amir Eva

সরকার প্রতিটি জেলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিস প্রতিষ্ঠা করেছে। একজন সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজ পদমর্যাদার বিচারক লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন। এই লিগ্যাল এইড অফিসার পদটি সৃষ্টি করা হয়েছে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন,২০০০ এর ২১(ক) ধারা বলে তবে তার দায়িত্ব ও কার্যাবলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে “আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা, ২০১৫ তে। এই বিধিমালা অনুযায়ী লিগ্যাল এইড অফিসারের দুই ধরণের দায়িত্ব রয়েছে, ১. বিচার প্রার্থীদের আইনি পরামর্শ দেয়া এবং ২. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) এর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা।

লিগ্যাল এইড অফিসারের দায়িত্ব ও কার্যাবলী

ধনী গরীব নির্বিশেষে যে কেউ আইনি পরামর্শ পাওয়ার জন্য সরাসরি লিগ্যাল এইড অফিসারের শরণাপন্ন হতে পারে। এমনকি আইনগত সহায়তা প্রদান সম্পর্কিত জেলা কমিটি বরাবর আবেদন করলে সেই কমিটিও আইনি পরামর্শের জন্য লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে আবেদনকারীকে প্রেরণ করতে পারে। আইনি পরামর্শ দেবার সময় লিগ্যাল এইড অফিসার যদি দেখেন যে, আবেদনকারীর সমস্যটিতে মামলা দায়ের করার মত কিছু নেই, তখন তিনি তাকে যথাযথ পরামর্শ দিয়ে আইনগত সহায়তা করবেন। তবে মামলা দায়ের করবার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ থাকলে অফিসার প্রথমেই মামলা দায়ের না করে সমস্যাটি এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দেবেন। আর এভাবেই লিগ্যাল এইড অফিসার নিয়মিত মোকদ্দমার জটিলতার বাইরে গিয়ে একজন বিচার প্রার্থীকে সুনির্দিষ্ট বিকল্প ধারায় ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতকরণে নিয়োজিত।

তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কোনো আবেদনকারী এডিআর এর মাধ্যমে তার সমস্যার নিষ্পত্তি করতে আগ্রহী না হলে তার আবেদন জেলা কমিটি বরাবর প্রেরণ করা হয় এবং জেলা কমিটি নিয়মিত মোকদ্দমার জন্য আবেদনকারীকে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ বা নিয়মিত মোকদ্দমা যেভাবেই হোক, লিগ্যাল এইড একজন নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার সুনিশ্চিত করে।

২০১৩ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ এপ্রিল কে “জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সে থেকে গত কয়েক বছর ধরে সারাদেশে এ দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালিত হচ্ছে। সর্বোপরি, সর্বোচ্চ প্রচার ব্যবস্থার মাধ্যমে এই আইনগত সহায়তা বা লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের বিস্তৃতি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অসচ্ছল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া খুবই জরুরী।


এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন:

Mahmuda Amir Eva

মাহমুদা আমির ইভা, শিক্ষার্থী (এলএল.এম) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। e-mail: [email protected]

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: