সন্তানের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ব

বাবা মায়ের অমূল্য সম্পদ হচ্ছে তাদের সন্তান। সাধারণত কোন পরিবারে সন্তানের ভাল মন্দের দায়িত্ব বাবা মা মিলে ঠিক করে থাকেন। যেখানে বাবা মূলত সন্তানের ভরণ-পোষণ এবং মা লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন এবং আমরাও সামাজিক ভাবে তাই দেখতে অভ্যস্ত। তাই কার কতটুকু দায়িত্ব ও অধিকার এবং সে সেটা কিভাবে আইনগত ভাবে পালন করবে এই বিষয় আমাদের মনে হয়তো সহসাই প্রশ্ন জাগে না কিন্তু, বাস্তবতা হল এই সবার জীবন একরকম হয় না তখন আমাদের প্রকৃত আইন জানাটা খুব জরুরি হয়ে পরে।

সন্তানের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্ব

সন্তানের অভিভাবকত্ব

যেমন ধরুন,

  • স্বামী – স্ত্রী (ডিভোর্স) আলাদা হয়ে গেল তখন সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে বা সন্তান কার কাছে থাকবে?
  • সন্তানের ভরন-পোষণ কে দেবে?
  • নাবালক সন্তানের সন্তানের সম্পত্তি কিভাবে ও কে দেখাশুনা করবে?
  • সন্তানের প্রতি মায়ের দায়িত্ব ও অধিকার কেমন হবে?
  • মায়ের কাছে সন্তান থাকলে কি বাবা খোরপোষ দিতে বাধ্য?
  • বাবা বা মা তার দায়িত্ব না পালন করলে কি করা যায়? কোন আইন বা আদালতে শরণাপন্ন হতে হবে?  – ইত্যাদি

চলুন উত্তর খোজার আগেই আমরা দুটো শব্দ ভাল করে বুঝে নেই যাতে করে আইনে ঢুকে আমাদের বিভ্রান্তি না তৈরি হয়।

অভিভাবকত্ব কি?

যারা নিজেদের দেখাশোনা করতে পারেনা বা সমাজের সাধারণ মানুষে মত ভাল-মন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই, যেমন নাবালক, শিশু, নির্বোধ, উন্মাদ এদের দৈনন্দিন চলার পথে এবং আইন কানুন মানতে একজন বোঝের মানুষের উপর নির্ভর করতে হয় এবং সাধারণত তারাই তার নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা গুলো, যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি দিতে বাধ্য থাকেন। এই দায়িত্ব প্রাপ্ত মানুষটি ঐ মানুষটির (নাবালক, শিশু, নির্বোধ, উন্মাদ) আইনগত অভিভাবক। তার মানে এই মানুষটির কিছু আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে।

দায়িত্ব / হেফাজত / হিজানত / জিম্মাদার / তত্ত্বাবধায়ক কি?

উপরের আলোচনার সাথে মিল রেখে যদি চিন্তা করি তাহলে বলা যায় কিছু ক্ষেত্রে কিছু মানুষের কিছু বিশেষ ধরনের ব্যবস্থা বা অবস্থার প্রয়োজন হয়। যেমন ধরুন একজন মানুষিক রোগী (উন্মাদ) তার সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে রাখা হোল এখানে ঐ উন্মাদে আইনগত অভিভাবকের এই বিশেষ জ্ঞান না থাকার কারণে তাকে তাকে হাসপাতালে ডাক্তারেরে জিম্মায় রাখা হোল। সাধারণ ভাবেই ডাক্তারের কাজ হল চিকিৎসা করা ঐ লোকে সম্পত্তি দেখা না। তাই এখানে ডাক্তারকে নির্দিষ্ট সময়ে সুধু বিশেষ কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্বকে আমার কোন নির্দিষ্ট বিষয় অভিভাবকত্বও বলতে পারি।

আশা করি এই দুটি বিষয় এখন পরিষ্কার হয়েছে। তাই বোঝাই যাচ্ছে উপরুক্ত বিষয় দুটো শিশু সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এখন চলুন দেখি, সন্তানের অভিভাবকত্ব কে পাবেন এবং আইন কি বলে?

অভিভাবকত্ব আমার দুই ভাগে ভাগ করতে পারি;

  • সন্তানের অভিভাবকত্ব (সার্বিক; দায়িত্ব ও কর্তব্য)
  • সন্তানের  সম্পদের অভিভাবকত্ব

সন্তানের অভিভাবকত্ব

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে, পিতা হচ্ছেন সন্তান ও সন্তানের সম্পত্তির প্রাকৃতিক ও আইনগত অভিভাবক। পিতা জীবিত থাকতে ও আইনগত ভাবে অক্ষম না হলে অন্য কারও অভিভাবকত্ব লাভের সুযোগ বা প্রয়োজন ঘটে না। কিন্তু বাবা জীবিত ও সক্ষম থাকতেও নাবালকের হিজানত অন্য কারও কাছে দেওয়ার সুযোগ বা প্রয়োজন ঘটতে পারে। বাবার পরে বাবা কর্তৃক ইচ্ছাপত্র (উইল) দ্বারা নিয়োগকৃত ব্যক্তি, দাদা ও দাদা কর্তৃক ইচ্ছাপত্র (উইল) দ্বারা নিয়োগকৃত ব্যক্তি ও অভিভাবক হতে পারেন।

তারপরে প্রয়োজনে আদালত নাবালকে / নাবালিকার অভিভাবক নিয়োগ করে এই ক্ষেত্রে ঐ নাবালকের বংশের কেউ বা বাবার দিকের কেউ দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। যেমন, বাবার বাবা_ যত ওপরেই হোক,  আপন ভাই, রক্ত সম্পর্কের ভাই, আপন ভাইয়ের ছেলে, রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে, বাবার আপন ভাইয়ের ছেলে,  বাবার রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে। একজন পুরুষ আত্মীয় একজন নাবালিকার জিম্মাদার কেবলমাত্র তখনই হতে পারবেন যখন তিনি ওই নাবালিকার (বিয়ের জন্য) নিষিদ্ধ স্তরের আত্মীয় হন। যে ক্ষেত্রে এ রকম কোনো আত্মীয়ও নেই, সে ক্ষেত্রে আদালত তার স্ব-বিবেচনামূলক ক্ষমতাবলে যে কাউকে নাবালক, নির্বোধ, উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির অভিভাবক নিয়োগ করতে পারে। সাধারণত মা কখন অভিভাবকত্ব পায় না।

মায়ের অভিভাবকত্ব

মায়ের অভিভাবকত্ব

বিশেষ ক্ষেত্রে মায়ের অভিভাবকত্ব:

সাধারণত মা কখন অভিভাবকত্ব পায় না। বর্তমানে আদালত অনেক কিছু বিবেচনা করে, যেমন; আর্থিক অবস্থা, পরিবেশ, শিক্ষা, আইনানুগটা, সামাজিক অবস্থা এই সব বিবেচনা করে যদি আদালতে মনে হয় যে সন্তান তার মায়ের কাছে থাকলেই সবচেয়ে ভাল থাকবে এবং মাও তাই চান তবে আদালত মাকে আইনগত অভিভাবকের দায়িত্ব প্রদান করতে পারেন। এই নীতিটি ‘ওয়েলফেয়ার ডকট্রিন’ নামেও পরিচিত, ১৮৯০ সালের ‘দ্য গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট’ নামক যে আইন দ্বারা অভিভাবকত্ব বা হিজানতের বিষয়গুলো চালিত হয়, তাতেই (ধারা ১৭) ওই নীতির কথা বলা আছে যদিও এর প্রয়োগ হাতে গোনা দু-একটি মাত্র।

সন্তানের  সম্পদের অভিভাবকত্ব সম্পৃক্ত বিষয়:

আইনগত অভিভাবক কিছু জরুরি বা বিশেষ কারণে নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর অথবা বন্ধক দিতে পারেন, যেমন, ওই সন্তানের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য তার অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি অথবা বন্ধক দিতে পারেন কিংবা নাবালকের ভরণপোষণ, উইলের দাবি, ঋণ, ভূমিকর পরিশোধ ইত্যাদির জন্য একজন আইনগত অভিভাবক নিচের এক বা একাধিক কারণে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। যেমন,

  • ক্রেতা দ্বিগুণ দাম দিতে প্রস্তুত থাকলে।
  • স্থাবর সম্পত্তিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যা না বিক্রি করলে দাম এমন কমে যাবে যা আর পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
  • সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে।

তবে আদালতকর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক হয়ে থাকলে তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো কারণেই সম্পত্তির কোনো অংশ বিক্রি, বন্ধক, দান, বিনিময় বা অন্য কোনো প্রকার হস্তান্তর করতে পারবে না। নাবালককে রক্ষার জন্য আইনগত অভিভাবক বা আদালত নিযুক্ত অভিভাবক না হয়েও যে কেউ নাবালকের অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারেন। বাস্তবে এ রকমভাবে যিনি অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন তিনিই হলেন কার্যত অভিভাবক। তবে তিনি কোনো অবস্থাতেই সম্পত্তির স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকার হস্তান্তর করতে পারবেন না।

দায়িত্ব / হেফাজত / হিজানত / জিম্মাদার / তত্ত্বাবধায়ন কখন ও কিভাবে?

আমরা জানি সন্তান তথা শিশুদের বিশেষ সেবা যত্নের প্রয়োজন হয় আবার মেয়ে শিশুদের সয়:সন্ধিকাল পর্যন্ত মাকে বিশেষ ভাবে প্রয়োজন হয় । এমনি বিশেষ দিক বিবেচনা করে মুসলিম আইনে মাকে সন্তানের হেজানতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই, ছেলে সন্তানের সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের বয়ঃসন্ধি কাল পর্যন্ত মায়ের দায়িত্বে থাকে।  অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটলে বা স্বামী মারা গেলে ছেলে সন্তান ৭ বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তান বয়োঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকবে, এটাই আইন। এক্ষেত্রে মায়ের অধিকার সর্বাগ্রে স্বীকৃত। এ সময়ের মধ্যে মায়ের অগোচরে যদি বাবা জোরপূর্বক সন্তানকে নিজের হেফাজতে গ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে বাবার বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা পর্যন্ত দেয়া যাবে। [৪৬ ডিএলআর-এর আয়েশা খানম বনাম মেজর সাব্বির আহমেদ]

সাধারণত সুন্নি হানাফি আইনের অধীনে নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সন্তানের হেফাজতের কোনো অধিকার মায়ের কাছে অবশিষ্ট থাকে না। তবে পরে আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, শুধু নাবালক থাকাকালেই নয়, সন্তানের কল্যানার্থে নির্দিষ্ট বয়সের পরেও মায়ের জিম্মাদারিত্বে সন্তান থাকতে পারে। যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে, সন্তানের কল্যাণ হবে এবং স্বার্থ রক্ষা হবে- সেক্ষেত্রে আদালত মাকে ওই বয়সের পরেও সন্তানের জিম্মাদার নিয়োগ করতে পারেন। [ আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এস এম এ বকর ৩৮ ডিএলআরে]

যেসব ককারণে মা তার এই বিশেষ দায়িত্ব হারাতে পারেন:

  • নীতিহীন জীবনযাপন করলে,
  • যদি এমন কারো সঙ্গে তার বিয়ে হয় যিনি শিশুটির নিষিদ্ধ স্তরের মধ্যে ঘটলে তার ওই অধিকার পুনর্জীবিত হয়, [১৬ ডিএলআরের জোহরা বেগম বনাম মাইমুনা খাতুন মামলায় আদালত বলেন, নিষিদ্ধ স্তরের বাইরে মায়ের বিয়ে হলেই মায়ের কাছ থেকে হেফাজতের অধিকার চলে যাবে না। মা যদি তার নতুন সংসারে সন্তানকে হেফাজতে রাখতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাকে সন্তানের জিম্মাদারি দিতে কোনো সমস্যা নেই।]
  • সন্তানের প্রতি অবহেলা করলে ও দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে
  • বিয়ে থাকা অবস্থায় বাবার বসবাসস্থল থেকে দূরে বসবাস করলে
  • যদি সে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করে,
  • যদি সন্তানের পিতাকে তার জিম্মায় থাকা অবস্থায় দেখতে না দেয়।

তবে স্মর্তব্য যে, আদালতের আদেশ ছাড়া সন্তানের জিম্মাদারের অধিকার থেকে মাকে বঞ্চিত করা যায় না।

মাতার অবর্তমানে শিশুর জিম্মাদার:

মাতার অবর্তমানে শিশুর জিম্মাদারি মায়ের নিকটাত্মীয়দের কাছে চলে যাবে। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ক্রমধারা অবলম্বন করা হবে। মায়ের অবর্তমানে নাবালক শিশুর হেফাজতকারী পর্যায়ক্রমে হবেন মায়ের মা (নানি, নানির মা, যত ওপরের দিকে হোক), পিতার মা (দাদি, দাদির মা; যত ওপরের দিকে হোক), পূর্ণ বোন (মা, বাবা একই), বৈপিত্রেয় বোন (মা একই কিন্তু বাবা ভিন্ন), আপন বোনের মেয়ে (যত নিচের দিকে হোক), বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে (যত নিচের দিকে হোক), পূর্ণ খালা (যত ওপরের দিকে হোক), বৈপিত্রেয় খালা (যত ওপরের দিকে হোক), পূর্ণ ফুফু (যত ওপরের দিকে হোক)। উল্লিখিত, আত্মীয়রা কেবল ক্রমানুসারে একজনের অবর্তমানে বা অযোগ্যতার কারণে অন্যজন জিম্মাদারিত্বের অধিকারী হবেন।

মা অথবা অন্যান্য নারী আত্মীয়দের অবর্তমানে শিশুর জিম্মাদার হতে পারেন:

যারা হতে পারেন তারা হলেন: বাবা, বাবার বাবা (যত ওপরের দিকে হোক), আপন ভাই, রক্তের সম্পর্কের ভাই, আপন ভাইয়ের ছেলে, রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে, বাবার আপন ভাইয়ের ছেলে, বাবার রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। মনে রাখতে হবে, একজন পুরুষ আত্মীয় একজন নাবালিকার জিম্মাদার কেবলমাত্র তখনই হতে পারবেন যখন তিনি ওই নাবালিকার নিষিদ্ধস্তরের আত্মীয় হন।

Rayhanul Islam

রায়হানুল ইসলাম বর্তমানে আইন পেশায় নিয়জিত আছেন, এছাড়াও তিনি লেখালেখি করেন এবং ল হেল্প বিডির সম্পাদক। তথ্য ও প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনে: [email protected] more at lawhelpbd.com/rayhanul-islam

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: