দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার ও মোকদ্দমা স্থানান্তরের ক্ষমতা – দে. কা. ০৫
একটি মামলা কোন আদালতে দায়ের হবে তার নির্ভর করে আদালতগুলোর ক্ষমতার উপর, এই ক্ষমতার আরেক নাম এখতিয়ার। কোন আদালত বা জজ কি কি বা কোন কোন ক্ষমতা ব্যবহার করবেন এবং কিভাবে তা করবেন তা আইনে বলা আছে। এই ক্ষমতাগুলোকে আমারা নিচের মত করে ভাগ করতে পারি।
ক্ষমতা / এখতিয়ার [Jurisdiction]
বিষয় ভিত্তিক [Subjective]:
যে সব বিষয় নিয়ে কোন একটি আদালত কাজ করতে পারে সেগুলোকে বলা হয় বিষয় ভিত্তিক এখতিয়ার। যেমন ধরুন, দেওয়ানি আদালত শুধু দেওয়ানি বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে, পারিবারিক আদালত শুধু পারিবারিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল (আদালত) শুধু সেই আইনে প্রদত্ত বিষয়ে বিচার করতে পারে ।
এলাকা ভিত্তিক [Territorial]:
প্রত্যেকটি আদালতের একটি এলাকা ভিত্তিক ক্ষমতা থাকে, আদালত তার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোন মামলা গ্রহণ করতে পারেন না। যেমন, প্রত্যেক জেলার জন্য একজন জেলা জজ থাকেন, প্রত্যেক উপজেলার জন্য সহকারী জজরা থাকেনে।
আর্থিক এখতিয়ার [pecuniary jurisdiction]:
কোন আদালত কত টাকা মূল্যের বা সর্বোচ্চ কতো টাকার মূল্য মানের মামলা শুনবেন তাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে যার যাইরে আদালত ইচ্ছে করলেই যেতে পারেন না এবং সবাই সবরকম বিচার করতে পারেন না।
আরো দুই ধরনে এখতিয়ার রয়েছে;
- Original (মূল মামলা)
- Appellate (আপিল)
এই বিভিন্ন ধরনের এখতিয়ার বুঝতে আপনাকে আগে আমাদের আদালতসূমহের গঠন বুঝতে হবে, তাই আমাদের এই লেখাটি একটু পড়ে আসুন: Hierarchy of Courts in Bangladesh
আর্থিক এখতিয়ার
আর্থিক এখতিয়ারের বিষয়টি দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ [Civil Courts Act, 1887] এর ১৯ ধারায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে;
- সহকারী জজ – ১ টাকা থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত
- সিনিয়র সহকারী জজ – ২ লক্ষ ১ টাকা থেকে ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত
- যুগ্ম জেলা জজ – ৪ লক্ষ টাকার উপরের সব
এবার এ সম্পর্কিত কিছু আইনের ধারা দেখে নেই।
দেওয়ানী কার্যবিধিতে এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
ধারা, ১৫ প্রতিটি মামলা তার সর্বনিন্ম এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে দায়ের করতে হবে।
[এখানে আর্থিক এখতিয়ারের কথা বলা হয়েছে] তার মানে ২ লক্ষ ১ টাকার মূল মামলা হয় তবে তা শুধুমাত্র সিনিয়র সহকারী জজ আদালতেই করা যাবে, যেহেতু সিনিয়র সহকারী জজ আদলত-ই এই মূল্যের জন্য সর্বনিন্ম আদালত।
এলাকাভিত্তিক এখতিয়ার।
ধারা, ১৬-১৮ স্থাবর সম্পত্তির ব্যপারে কথা বলেছে;
ধারা, ১৬ যেখানে মামলার বিষয় বস্তু থাকবে সেখানে মামলা দায়ের করতে হবে।
ধারা, ১৭ যদি জমি দুই জেলায় / এলাকায় পরে তবে যে কোন একটি আদালতে করলেই হবে।
ধারা, ১৮ এমন অবস্থায় যেখানে একাধিক আদালতের কোনটিতে যে আসলে পরেছে তার বোঝা যায় না তখন যে কোন একটি আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে।
ধারা, ১৯ এবং ২০ অস্থাবর সম্পত্তির বপারে কথা বলে।
ধারা, ১৯ যেখানে কোন অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের [মামলা] বিষয় রয়েছে সেখান, বাদী যদি এক আদালতের এখতিয়ারে বসবাস করে এবং বিবাদী অন্য আদালতের এখতিয়ারে:-
- বসবাস করে বা,
- ব্যবসা করে বা,
- [লাভজনক] কাজ করে
তখন বাদী তার প্রয়োজনমত যে কোন একটি স্থানে মামলা করতে পারে।
ধারা, ২০ অস্থাবর সম্পত্তির ব্যপারে ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন বিষয় হলে ;
– যেখানে বিবাদী বসবাস করে অথবা
– যেখানে কজ অব একশন / নালিশের কারণ / ঘটনাটির উদ্ভব হয়েছে সেখানে মামলা করতে হবে।
এখতিয়ারে আপত্তি
ধারা, ২১ এখতিয়ারে আপত্তি:
আদালতের এখতিয়ার বিষয়ে কোন পক্ষের আপত্তি থাকলে তা যথাসম্ভব প্রথম দিকে আপত্তি সহকারে আদালতে তুলে ধরতে হবে। তা না হলে পরবর্তীতে আপত্তি করলে আদালত তা নাও শুনতে পারেন। তবে, ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপিল বা রিভিশন বিষয়টি বিবেচনায় নিলে নিতে পারে।
এখতিয়ারের সাথে আদালতে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও ক্ষমতার ক্রম সরাসরি যুক্ত তাই মামলা স্থানান্তরের ক্ষমতাও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।
মামলা স্থানান্তর ক্ষমতা (ধারা, ২২-২৪)
ধারা, ২২; যখন একাধিক আদালতের যে কোন একটিতে কোন এক পক্ষ মামলা দায়ের করেন কিন্তু অন্য আদালতেও মামলা দায়ের করা যায় তখন অপর পক্ষ যে মামলা দায়ের করেছে সেই পক্ষকে নোটিশ দিয়ে অন্য আদালতে মামলা দায়েরর আবেদন করতে পারেন। তবে শর্ত থাকে যে এটি বিচার্য বিষয় গঠনের আগে বা ঐ সময়ের মধ্যে করতে হবে।
ধারা, ২৩; যখন একাধিক আদালত একই আপিল আদালতের অধীনস্থ হয় তখন সেই আপিল আদালতের নিকট অন্য আদালতে মামলা স্থানান্তরের আবেদন করা যায়। (ধারা ২২ কে সাথে নিয়ে এই অংশটুকু পড়তে হবে।)
উদাহরন; ধরা যাক, একটি মামলা ঢাকা জেলা সহকারী জজ আদালত -১ এ আছে এখন কোন পক্ষ তা ঢাকা জেলা সহকারী জজ আদালত -৩ এ স্থানান্তরিত করতে চায়, স্বাভাবিক ভাবেই এই দুই আদালতের আপিল আদালত জেলা জজ আদালত ঢাকা তাই স্থানান্তরের আবেদনটি জেলা জজ আদালত ঢাকাতে হবে।
আবার যখন এমন হয় যে, যে আদালতে কোন পক্ষ মামলাটি স্থানান্তর করতে চাচ্ছে তা স্বাভাবিক ভাবেই একই আপিল আদালতের আপিল এখতিয়ারে পরে না তখন মামলা হস্তান্তরের এই আবেদনটি হাইকোর্ট বিভাগে পেশ করতে হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ তখন মামলা স্থানান্তর করতে পারে।
উদাহরন; ধরা যাক, একটি মামলা ঢাকা জেলা সহকারী জজ আদালত -১ এ আছে এখন কোন পক্ষ তা নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী জজ আদালত -২ এ স্থানান্তরিত করতে চায়, এখানে এই দুই আদালতের আপিল আদালত জেলা জজ আদালত ঢাকা নয় বরং হাইকোর্ট বিভাগ তাই স্থানান্তরের আবেদনটি হাইকোর্ট বিভাগ হবে।
ধারা, ২৪; জেলা জজ আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগের সাধারণ স্থানান্তর ক্ষমতা।
জেলা জজ আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগ যে কোন সময় তাদের অধীনস্থ কোন আদালতের যে কোন মামলা তাদের অধীনস্থ অন্য কোন আদালতে হস্তান্তর করতে পারেন বা নিজেরাও বিচার করতে পারেন।
আশা করি এই মুল ধারাগুলো আপনাকে এখতিয়ার, এখতিয়ার বিষয়ক আপত্তি এবং মামলা স্থানান্তর ক্ষমতা বিষয় কনফিউসনগুলো দূর করতে সাহায্য করবে।
- দেওয়ানী প্রকৃতির মোকদ্দমা ও এখতিয়ার সম্পর্কে আরো একটু জানতে আমাদের ইংরেজী লেখাটি দেখুন
- আমাদের দেওয়ানী কার্যবিধি সিরিজের ৩য় (আগের) লেখাটি দেখুন এখানে: মামলা স্থগিতকরণ ও দোবারা দোষ
- আমাদের দেওয়ানী কার্যবিধি সিরিজের ৫ম (পরের) লেখাটি দেখুন এখানে: দেওয়ানী মোকদ্দমার পক্ষ ও মোকদ্দমা দায়ের
আমাদের আপডেটেড নোট, গাইড, ভিডিও টিউটোরিয়াল পেতে এবং আইন বিষয়ক বিভিন্ন ট্রেনিং, কোচিং, কোর্স কিনতে আমাদের আইন পাঠশালা ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন। ২০২৩ সালের বার কাউন্সিল MCQ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে আগ্রহী হলে দ্রুত আইন পাঠশালা ফেসবুক গ্রুপ এ সংযুক্ত হোন।